এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতি থেকে যেন অনেক প্রভাবশালী নেতা হারিয়ে যাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনে তারা তরুণ নেতাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হয়েছেন। সেই সাথে এই সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর তাদের আর কোথাও দেখা মিলছে না। সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীদের সাথে তাদের আর যোগাযোগ থাকছে না।
বিশেষ করে মাহে রমজানের ইফতারকে কেন্দ্র করে নেতারা তাদের অনুসারীদের নিয়ে নানা আয়োজন করলেও এসকল পরাজিত প্রভাবশালী নেতারা একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে তারা রাজনীতিতে ফিরবেন কিনা তা নিয়েও শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন সাবেক এমপিরা। যারা বিগত সময়ে সংশ্লিষ্ট আসনে সংসদ সদস্য পদে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারের নির্বাচনেও তারা সংসদ সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে তাদের নিজ দলীয় মনোনয়নের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
আর এই সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বিএনপি দলীয় পদও হারিয়েছেন। তারপরও তারা নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে আসেনি। নির্বাচনের মাঠে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা কেউই ঠিকে থাকতে পারেনি। বরং তারা সকলেই ভোটের মাঠে জামানত হারাচ্ছেন। তাদের কেউই প্রদত্ত ভোটের সাড়ে ১২ শতাংশ পাননি। যে কারণে তাদের জামানত হারাতে হবে।
এদিকে বিএনপিতেও তাদের আর ফেরার সুযোগ থাকছে না। নির্বাচন বিজয়ী হতে পারলে হয়তো তাদের মূল্যায়ন হতো। আবারও বিএনপির রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেতেন। কিন্তু ভোটের মাঠে টিকে থাকতে না পারায় অর্থাৎ বিজয় অর্জন করতে না পারায় তাদের 'আম-ছালা সবই গেল'। একই সাথে তাদের সংশ্লিষ্ট এলাকাতেও সম্মান আর থাকলো না। ফলে তারা সবদিক থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষিত ফলাফল থেকে জানা যায়- নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের মোট বৈধ ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৩ ভোট। আর এই আসনে স্বতন্ত্র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন বিএনপির সাবেক কয়েকবারের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর। আর ভোটের ফলাফলে তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা হচ্ছে ১৮ হাজার ৭৪৪ ভোট।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের মোট বৈধ ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৮৫২ ভোট। আর এই আসনে স্বতন্ত্র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং বিএনপির সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা হচ্ছে ২০ হাজার ৩৭৯ ভোট এবং রেজাউল করিমের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা হচ্ছে ৪ হাজার ৫৯৬ ভোট।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সদর) আসনের মোট বৈধ ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৭২৯ ভোট। আর এই আসনে স্বতন্ত্র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও মোহাম্মদ আলী। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট এবং মোহাম্মদ আলীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা হচ্ছে ১১ হাজার ৩২৮ ভোট।
নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৭ এবং ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিতে হয়। কোনো প্রার্থীকে জামানত রক্ষা করতে হলে মোট ভোটের কমপক্ষে এক-অষ্টমাংশ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে। এর কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে বা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। সে হিসেব অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের সকল সাবেক এমপিরা জামানত হারিয়েছেন।
এর আগে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় ৩ বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করেছিলো বিএনপি। গত ২১ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এই বহিষ্কারের তালিকায় ছিলেন- নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের মো. আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম।
তার আগে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি দলীয় মনোনীত প্রার্থীর আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ায় পরপরই বিএনপির দুই নেতাকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। গত ৩০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কারপ্রাপ্ত বিএনপির নেতাদের তালিকায় ছিলেন- সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য তাদেরকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য সহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিলো।
একদিকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার অন্যদিকে নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ে তাদের আর কিছুই থাকলো না। সবকিছু থেকেই তারা বঞ্চিত হলেন। আর এই বঞ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এবার রাজনীতি থেকেও যেন তারা হারিয়ে যাচ্ছেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে তাদের আর দেখা মিলছে না।




































আপনার মতামত লিখুন :