প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ বহুদিন ধরেই সম্ভাবনা আর সমস্যার এক অদ্ভুত সহাবস্থানের শহর। শিল্প-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হলেও নাগরিক সুবিধার প্রশ্নে পিছিয়ে পড়ার অভিযোগ নতুন নয়। যানজট, জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক, দখল হওয়া ফুটপাত, মশার উৎপাত ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে নগরবাসীর নিত্যদিনের জীবন এখন দুর্ভোগের আরেক নাম।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ঘণ্টার বেশি। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ডুবে যাচ্ছে হাঁটুসমান পানিতে। কোথাও কোথাও ময়লার স্তূপ যেন স্থায়ী স্থাপনা। জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের পর প্রশাসনিক শূন্যতায় নাগরিক সেবায়ও ধীরগতি তৈরি হয়েছে এমন ধারণা অনেকের।
এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী করপোরেশনে নির্বাচিত পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণকালীন প্রশাসক দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই শহরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তার নাম।
সাখাওয়াত হোসেন খানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ছাত্রজীবনে। মুন্সীগঞ্জে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক কৈশোরেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতি পেরিয়ে পরে নারায়ণগঞ্জে এসে আইন পেশার পাশাপাশি সংগঠন গড়ে তোলায় সক্রিয় হন। আইনজীবী সমিতির রাজনীতিতে তিনি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হওয়ার ঘটনা তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়। বিশেষ করে ২০১৪ সালের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় আইনজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে তার নেতৃত্বে টানা কর্মসূচি তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখে পরিণত করে। নানা চাপ, হুমকি ও মামলা মোকদ্দমার মধ্যেও অবস্থান থেকে সরে না দাঁড়ানোর ইতিহাস তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অধ্যায়। বিগত বছরগুলোতে একাধিক মামলায় আসামি হওয়া, কারাবরণ, এমনকি পরিবারের সদস্যদের হয়রানির অভিযোগ সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলা ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়া এবং পরবর্তীতে মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে আসা তাকে নগর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
নগরবাসীর একাংশ মনে করেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে কাজে লাগাতে পারবেন তিনি। সংগঠক হিসেবে কঠোর অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এই দুটি গুণের কথা তার সমর্থকেরা বারবার উল্লেখ করছেন।
তবে প্রত্যাশার সঙ্গে রয়েছে চ্যালেঞ্জও। জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যানজট কমাতে সমন্বিত ট্রাফিক পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এসব ইস্যুতে দৃশ্যমান পদক্ষেপই হবে তার সাফল্যের মাপকাঠি। শুধু রাজনৈতিক পরিচিতি নয়, প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষাও দিতে হবে তাকে।
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও সাধারণ নাগরিকরা এখন অপেক্ষায় শহরের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটাতে নতুন প্রশাসক কতটা দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেন। কারণ, শিল্পনগরীর অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখতে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, সাখাওয়াত হোসেন খানের হাতে অর্পিত হয়েছে এক কঠিন দায়িত্ব। আন্দোলনের রাজপথ থেকে প্রশাসনের টেবিলে এই রূপান্তরের সাফল্যই নির্ধারণ করবে নগরবাসীর আস্থা কতটা দৃঢ় হবে। এখন চোখ শহরবাসীর, ফলাফলের অপেক্ষায় নারায়ণগঞ্জ।
































আপনার মতামত লিখুন :