News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২

‘ওসমানীয়’ জমিয়ত তছনছ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১০:২৮ পিএম ‘ওসমানীয়’ জমিয়ত তছনছ

শাপলা চত্ত্বরের সেই আলোচিত সমাবেশে সবচেয়ে বেশী লোকজনের সমাগম ঘটিয়ে নারায়ণগঞ্জে হেফাজত ও জমিয়তে ওলামা ইসলাম সারাদেশের মধ্যে আলোচিত ছিল। শাপলা চত্ত্বরের ঘটনার পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর বুকটান করে চলা হেফাজত ক’ বছরের মধ্যেই নুইয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জে তৎসময়ের আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমানের তল্পিবাহক বনে যান ইসলামী সংগঠন ও দলের কয়েকজন নেতা। ওসমানদের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে হেফাজতের নাম বদলে যায় ‘ওসমানীয় হেফাজত’। তার নেতৃত্বে ছিলেন ফেরদাউসুর রহমান যাকে শামীম ওসমান ছোট ভাই হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দিতেন। ফেরদাউসও শামীম ওসমানের ক্যাডার শাহ নিজামের ডেরা নম পার্কে ঘাঁটি করে সেটাকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন এলাকার জমি সংক্রান্ত ঘটনা, স্বর্ণ চুরির ঘটনা চাপা দেওয়া সহ অনেক কাজেই আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের ব্যবহার করতেন ফেরদাউস। সবশেষ সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি দলীয় জোট থেকে জমিয়ত নেতা মনির হোসাইন কাসেমী অংশ নিলেও ফেরদাউস প্রচার করতেন তিনি শামীম ওসমান সহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমঝোতা করিয়ে তাদের ভোট টানবেন। শেষতক পরাজয় হলো কাসেমীর। বিতর্কে পড়লেন দুইজনই। আর সেই বিতর্ক এখন দুইজনের মধ্যে কলহের সৃষ্টি করেছে।

সবশেষ জমিয়তের সম্মেলন ঘিরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমে জেলা ও মহানগরের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে অবহিত করা হয়নি এবং কেন্দ্রীয় নেতাদেরও একপাক্ষিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলে মনির হোসেন কাসেমী নিজেকে এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। পরবর্তীতে নেতাকর্মীদের দাবির মুখে একটি নির্ধারিত কাউন্সিল স্থগিত করা হয়। এরপরও সংশ্লিষ্ট নেতারা কার্যক্রম চালিয়ে গেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও কামাল উদ্দিন দায়েমীকে শোকজ করা হয়। কিন্তু শোকজের পরও তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের ভিন্নভাবে অবহিত করে গোপনে ৯ এপ্রিল হীরা কমিউনিটি সেন্টারে কর্মী সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে খবর পেয়ে জেলা ও মহানগরের নেতারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সম্মেলনটি প্রতিরোধ করেন। তারা সকলেই মনির কাসেমীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারীদের নিয়ে হেফজাতে ইসলামের পর এবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারী নারায়ণগঞ্জ হেফাজত ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি করার পর এবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেও বিভক্তি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছিলেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে পুরোপুরিভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মুফতী মনির হোসাইন কাসেমী। তিনি ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারী কামাল উদ্দিন দায়েমীকে শোকজন নোটিশ পাঠিয়ে আপাতত তাদেরকে দূরে সরিয়েছেন। সন্তোষজনক উত্তর না মিললে তাদেরকে হয়তো জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে।

সেই সাথে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম ব্লগার আহম্মেদ রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যার ঘটনায় তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া গোল চত্বরকে ‘রাজীব চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চাষাঢ়ায় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ, রাজাকারদের ফাঁসির দাবি ও ব্লগার রাজীব হত্যার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশের আগে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড গেঁথে দেন এবং ফলক উন্মোচন করেন।

কিন্তু সেই ‘রাজীব চত্বর’ ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই শহরের ডিআইটি এলাক থেকে মিছিল নিয়ে এসে রাজীব গুড়িয়ে দেয়া হয়। যে মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন হেফাজতের নেতাকর্মীরা।

এরপর ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানী ঢাকায় শাপলা চত্ত্বর কায়েম করা হয়। আর এই শাপলা চত্ত্বরে ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের নেতারা সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন। এভাবে একের পর এক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতাকর্মীদের সাথে ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিদের নজর কাড়ে। তাদের যে কোনো কর্মসূচিতেই সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা অংশগ্রহণ করেন।

তবে এই আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতাও পরিরক্ষিত হয়। ২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো।

এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার।

ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা। ওই বছরের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেন।

মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়, ওই বছরের ৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানে রফিউর রাব্বি বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু কথা বলেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রফিউর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মসজিদ ভেঙে শপিংমল ও মাদ্রাসা উচ্ছেদ করে পার্ক করার অভিযোগ এনে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ। এদিন জুমার নামাজের পর শহরের চাষাঢ়া এলাকার বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশের সভাপতি হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান বলেছিলেন, মাসদাইর কবরস্থানের সামনে যেই মাদ্রাসা ছিলো সেটা নাকি সিটি করপোরেশন ভাঙে নাই। আমার প্রশ্ন সিটি করপোরেশন যদি না ভাঙে তাহলে এই সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কে ভাঙলো। কার এতো বড় শাহস, যে এই মাদ্রাসা ভাইঙ্গা দিলো। আসলে ওনার (মেয়র আইভী) কোরআন তেলোয়াত ভালো লাগেনা। সে মাথায় কাপড় দিতে চায়-না, পুরুষ সাজতে চায়।

এভাবে একের পর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ফেরদাউসের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে আখ্যা পান। মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান মহানগর হেফাজত ইসলামকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এ নিয়ে কেউ কিছু বলতেন না।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই ফেরাদউসকে নিয়ে হেফাজত ইসলামের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভের সূত্র ধরেই এবার তাকে মহানগর হেফাজতের একক নেতৃত্বে চাননি একটি অংশ।

একই সাথে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের মিছিলে দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এদিন জুমআর নামাজের পর শহরের ডিআইটি কেন্দ্রীয় রেলওয়ে জামে মসজিদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। প্রায় মিনিট দশেক ধরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে হৈ চৈ ও হাতাহাতি চলে। পরে সিনিয়ররা নেতারা বার বার অনুরোধ করলে থামে। তবে পণ্ড হয়ে যায় পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল। পরবর্তীতে অপর একটি গ্রুপ মিছিল করে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

কিন্তু এসকল সমস্যার সমাধান না করেই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজত ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা করে দেয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলামের দুইজন নায়েবে আমীর থাকলেও তাদের একজনও কমিটি ঘোষণার সময়ে তারা কেউই ছিলেন না। সেই সাথে হেফাজতের একটি অংশের নেতাকর্মীরা এই কমিটিকে মেনে নেননি। তারা প্রত্যাখানের ঘোষণা দেন।

গত বছরের ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় শহরের বাগে জান্নাত মসজিদের দ্বিতীয় তলায় প্রতিনিধি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলাম সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এই কমিটি ঘোষণা করেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফজত ইসলামের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে রয়েছেন মুফতি মনির হোসাই কাসেমী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন এবিএম সিরাজুল মামুন। সেই সাথে মহানগর হেফাজত ইসলামের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মুফতি হারুনুর রশদি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহ।

কিন্তু এই কমিটি ঘোষণার পর থেকেই হেফাজতের একটি অংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দেয়। হেফাজতের নেতাকর্মীদের দাবী ছিলো নতুন কমিটিতে আওয়ামী লীগের দোসরদের জায়গা দেয়া হবে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে যারা ওসমান পরিবারের দোসর হিসেবে পরিচিত তাদেরকে জায়গা দেয়া হয়েছে। যা ওসমানীয় হেফাজত আখ্যা দিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না।

এদিকে এই দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখায় নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান থেমে নেই। তিনি বিভিন্ন ব্যানারে সরব রয়েছেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুফতি মনির কাসেমীকে সামনে রেখে তার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নির্বাচনের পর তিনি জমিয়ত উলামায়ে ইসলামকে নিজের মতো করে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগটি যেন ফেরদাউসুর রহমানের হাতছাড়া হয়ে গেলো।