সম্প্রতি নড়াইলে ৩ মাস বয়সী এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন তার মা। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই জঘন্য অপরাধে কি শুধুই সেই মা দায়ী?
গর্ভাবস্থার শুরু থেকে সন্তান জন্মদান পর্যন্ত একজন মায়ের শরীর ও মনে যে বিশাল পরিবর্তন ঘটে, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। নিজের শরীর নিংড়ে দিয়ে একটি নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে আনার পরই শুরু হয় এক অজানা, অভিজ্ঞতাহীন দায়িত্বের পথচলা। ক্লান্ত শরীর, নির্ঘুম রাত, সারাক্ষণের দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতা।
আর যদি সেই শিশুটি হয় কলিক বেবি (অতিরিক্ত কান্না, অস্থিরতা), তাহলে সেই পরিস্থিতি কতটা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, তা কেবল সেই মা-ই বুঝতে পারেন।
আমি নিজেও একজন মা। আমার ২ বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান আছে। জন্মের পর থেকে অসংখ্য রাত কেটেছে তার নিরবচ্ছিন্ন কান্নার মধ্যে। ডাক্তার দেখানো হয়েছে, হুজুরের ঝাড়ফুক তবুও কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেড় মাসের মাথায় হালকা কাশি থেকে নিউমোনিয়া। শ্বাসকষ্ট, বমি, তীব্র কাশি সেই ছোট্ট শিশুটির কষ্ট আজও মনে পড়লে চোখ ভিজে যায়।
প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রশ্ন করেছি এটা কি আমার ব্যর্থতা? আমার কোনো ভুল? এই অপরাধবোধ, উদ্বেগ আর অসহায়ত্ব একজন মাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
এরপর ২ মাস ৮ দিন বয়সী শিশুকে নিয়ে শুরু হয় একা পথচলা মায়ের বাড়ি থেকে নিজের সংসারে ফেরা। বাচ্চার বাবা সারাদিন অফিসে, রাতে ক্লান্ত শরীরে যতটুকু সাহায্য করেছেন, তা অস্বীকার করার নয়। তবুও দিনের পর দিন একাকিত্ব, ক্লান্তি আর দায়িত্বের চাপ ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে শিশুর বারবার অসুস্থতা প্রায় প্রতি মাসেই ২ থেকে ৩ বার কোনো না কোনো ঠান্ডাজনিত তীব্র সমস্যা। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ আমার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
৬ মাস বয়সে আমার মেয়েটা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত সেই সময় আমি মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছি। দীর্ঘ ২৩ দিনের অসুস্থতায় কয়েকবার হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। একই সময়ে আবার নিউমোনিয়া প্রতিদিন ১টি করে ৭টি ইনজেকশন। সেই সময়টা ছিল একেবারেই অসহনীয়।
জন্ম থেকেই এখন পর্যন্ত আমার এই টডলার শিশুটির সামনে থেকে ২ মিনিটের জন্যও নড়তে পারি না। রান্নাঘর, বারান্দা, বাথরুম সব জায়গায় সে আমার ছায়াসঙ্গী। এমনকি গোসলের সময়ও তাকে সঙ্গে নিতে হয়। একটু আড়াল হলেই চিৎকার, কান্নাকাটি। একবেলার খাবার খাওয়াতে ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। অকারণ জেদ, কান্না সব সামলাতে গিয়ে নিজের খাওয়া-ঘুম কিছুই ঠিকমতো হয় না। ক্লান্তি জমতে থাকে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও কখনো কখনো সেই চাপ পড়ে যায় আমার সোনামনির ওপর আর তখনই অপরাধবোধ আর হীনমন্যতা গ্রাস করে। কিন্তু সত্যিটা হলো বাচ্চা সামলানোর থেকেও অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে আশেপাশের মানুষের আচরণ।
এই পথচলায় যতজন মানুষকে পাশে পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি পেয়েছি সমালোচক। আমার চোখে তারাই সবচেয়ে নির্মম (কথার খুনী)। তাদের অবহেলা, কটাক্ষ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য একজন মাকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দেয়। হুট করে এসে এমনভাবে কথা বলবে, যেন আপনি কিছুই করেননি, কিছুই পারেন না সব পারে শুধু তারা। তাদের খুব পরিচিত একটি কথা “আমরা কি বাচ্চা পালি নাই?”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সময়টা ছিল ভিন্ন। পরিবারে অন্য কেউ না কেউ সাহায্য করত, বাচ্চা দেখার মানুষ ছিল। আজকের মতো একা ফ্ল্যাটবন্দি জীবন ছিল না। মাঠে-ঘাটে, বাড়ির উঠানে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছে শিশুরা। আর আজ একজন মা একাই লড়ছে ২৪ ঘণ্টা।
এই অবহেলা আর কটাক্ষই অনেক সময় বাচ্চা পালার চেয়েও বেশি মানসিক চাপ তৈরি করে। একজন ক্লান্ত, ঘুমহীন, উদ্বিগ্ন মায়ের কাছে এসব কথা শুধু কষ্ট নয়, এক ধরনের মানসিক আঘাত।
সত্যিই সন্তানের ভালো-মন্দের দায় শেষ পর্যন্ত মায়েরই এটাই সমাজের নিয়ম। কিন্তু একজন সদ্য মাকে শুধু বাড়ির বউ বা স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন নতুন, অনভিজ্ঞ, শিখতে থাকা মা হিসেবে দেখার প্রয়োজন আছে। তার পাশে দাঁড়ান। তাকে সময় দিন। তার কথা শুনুন। তাকে একটু বিশ্রামের সুযোগ দিন। বাচ্চার যত্নে সাহায্য করুন। তার কাজগুলো সহজ করে দিন।
কারণ, মাতৃত্ব শুধু ভালোবাসার গল্প নয় এটি এক কঠিন, অবিরাম সংগ্রামের নাম।






































আপনার মতামত লিখুন :