প্রতিদিন আমাদের জীবন মানেই সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত। কখন ঘুম থেকে উঠব, কোন রাস্তায় যাব, কোন কাজটা আগে করব- এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই দিনের রূপ ঠিক করে। আবার বড় সিদ্ধান্তও নিতে হয়: কোন চাকরিটা বেছে নেব, কোথায় পড়াশোনা করব, জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করব কি না। এসব সিদ্ধান্ত আমাদের এগিয়ে নেওয়ার পথ ঠিক করে।
কিন্তু অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আটকে যান। একাধিক বিকল্পের সামনে দীর্ঘ সময় দ্বিধায় ভোগেন। কী করবেন, কী করবেন না- এই দোলাচলে সময় চলে যায়। শেষ পর্যন্ত হয়তো কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় না। ধীরে ধীরে থমকে যায় এগিয়ে চলার গতি। এ অবস্থাকেই বলা হয় সিদ্ধান্তহীনতা।
হেল্থ এন্ড হোপ হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জিল্লুর কামাল বলেন, সিদ্ধান্তহীনতা কোনো মানসিক রোগ নয়। এটি মূলত একটি আচরণগত অভ্যাস বা মানসিক দুর্বলতা, যা সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চললে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং জীবনের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি হয়।
ডা. জিল্লুর আরও বলেন, অনেক সময় মানুষ নতুন কিছু শুরু করতে চায়, নিজের পছন্দের পথে হাঁটতে চায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়। কিন্তু ব্যর্থতার ভয়, সমালোচনার আশঙ্কা এবং নিজেকে নিয়ে দ্বিধা তাদের আটকে রাখে। একাধিক সিদ্ধান্ত একসঙ্গে নিতে গিয়ে শরীর এবং মনের ওপর চাপ পড়লে দেখা দেয় ডিসিশন ফ্যাটিগ বা সিদ্ধান্ত ক্লান্তি। এই অবস্থায় মানুষ ছোট বড় যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াতেও হিমশিম খায়।
সিদ্ধান্তহীনতার শিকড় অনেক সময় শৈশব থেকেই গেঁথে যায়। যেসব শিশুর ছোটবেলা থেকেই সব সিদ্ধান্ত বাবা-মা বা পরিবারের বড়রা নেয়, তারা বড় হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, হতাশা বা আত্মমূল্যবোধের অভাবও এ সমস্যা বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ভাবনা, নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা এবং ভুলকে ভয় পাওয়ার মানসিকতা সিদ্ধান্তহীনতাকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে আশার কথা হলো, সিদ্ধান্তহীনতা স্থায়ী নয়। সচেতন চর্চার মাধ্যমে এটিকে বদলানো সম্ভব। প্রতিদিনের ছোট ছোট বিষয়ে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ভুলকে ব্যর্থতা না ভেবে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলে ভয় কমে যায়। অপ্রয়োজনীয় বিকল্প কমিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করলে দ্বিধার জট আলগা হয়।
জীবন থেমে থাকে না, সময় অপেক্ষা করে না কারও দ্বিধার জন্য। তাই নিখুঁত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে না থেকে সচেতনভাবে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসই মানুষকে থেমে থাকা জীবন থেকে এগিয়ে নেওয়ার পথে দাঁড় করাতে পারে।









































আপনার মতামত লিখুন :