News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বারবার উচ্ছেদের পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না ফুটপাত


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ১০:২৩ পিএম বারবার উচ্ছেদের পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না ফুটপাত

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের যে সংকট চলছে, তা যেন নতুন করে আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। সিটি করপোরেশনের ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সবকিছুর পরও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আবারও ফুটপাত দখল করে বসতে শুরু করেছে হকাররা। ফলে কয়েকদিনের জন্য স্বস্তি ফিরে পেলেও পুনরায় পুরোনো দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারীরা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন নগরবাসী।

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া, বঙ্গবন্ধু সড়ক, নূর মসজিদ এলাকা, কালীরবাজার, দুই নম্বর রেলগেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এসব এলাকার ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে হকারদের একটি অংশ। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে চলাচল করতে হয়। এতে যেমন বাড়ছে যানজট, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত কয়েক মাস ধরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। প্রশাসনের এসব অভিযানে অনেক জায়গা সাময়িকভাবে দখলমুক্তও হয়। ফুটপাত খালি হওয়ায় স্বস্তি ফিরে আসে সাধারণ মানুষের মাঝে। অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার হয়তো দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে। কিন্তু সেই আশাবাদ বেশিদিন টেকেনি।

গত ৩ মে নগরীর চাষাড়া নূরমসজিদ এলাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার সময় সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দেয়। অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদে বাধা দিতে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায় হকারদের একটি অংশ। এতে কয়েকজন কর্মচারী আহত হন। ঘটনার পর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নগরবাসীর অনেকে মনে করছেন, ঘটনার পর কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় হকারদের একটি অংশ আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।

হামলার পর থেকেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ফুটপাত দখলের চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। যেখানে কয়েকদিন আগেও মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন, সেখানে এখন আবার দোকান, কাপড়ের স্টল, ফলের ভ্যান কিংবা বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান বসতে দেখা যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়কে হাঁটতে হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখে আসলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালায়, কয়েকদিন ফুটপাত খালি থাকে, পরে আবার দখল হয়ে যায়। ফলে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে মানুষের আস্থাও কমতে শুরু করেছে। অনেকের প্রশ্ন, যদি অভিযান স্থায়ী ফল না দেয়, তাহলে বারবার উচ্ছেদ করেও লাভ কি।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য। কোনোভাবেই তা দখল করে রাখার সুযোগ নেই। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জীবিকার প্রশ্নে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সহিংসতা কিংবা প্রশাসনের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনদুর্ভোগ কমাতে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিকল্প নেই।

তবে হকারদের একটি অংশ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলে হাজার হাজার পরিবার জীবিকা হারাবে। তারা বলছেন, অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন। হঠাৎ করে উচ্ছেদ করলে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তাই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদকে তারা অমানবিক হিসেবে দেখছেন।

এপ্রিলজুড়ে বিভিন্ন সময়ে হকারদের ব্যানারে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও মিছিলও হয়েছে। তারা নির্দিষ্ট হকার জোনের দাবি তুলেছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবির আড়ালে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যারা রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব ব্যবহার করে বারবার ফুটপাত দখল করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব জায়গা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল জীবিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ একদিকে নগরবাসীর চলাচলের অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে হাজারো মানুষের জীবিকার প্রশ্নও রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতি বারবার সংঘাতের দিকেই যাবে। তারা মনে করছেন, শহরের নির্দিষ্ট স্থানে পরিকল্পিত হকার জোন তৈরি, নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, সময়ভিত্তিক ব্যবসার অনুমতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এছাড়া প্রশাসনের ধারাবাহিক নজরদারি ও আইনের কঠোর প্রয়োগের কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কোনো উচ্ছেদ অভিযানের পর যদি নিয়মিত মনিটরিং না থাকে, তাহলে পুনর্দখল ঠেকানো সম্ভব নয়। একইসঙ্গে হামলা কিংবা প্রশাসনের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণ পথচারীদের ভাষ্য, ফুটপাত মানুষ হাঁটার জন্য তৈরি হলেও বাস্তবে তা এখন ব্যবসার জায়গায় পরিণত হয়েছে। ফলে নগরবাসী প্রতিদিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং চলাচলে অসুবিধা সব মিলিয়ে শহুরে জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তাই তারা চান, প্রশাসন যেন কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে স্থায়ী সমাধানের পথে এগোয়।

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে ফুটপাত দখল ইস্যু এখন শুধু উচ্ছেদ বা পুনর্দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বার্থ, জীবিকা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বারবার উচ্ছেদের পরও যদি ফুটপাত দখলমুক্ত না থাকে, তাহলে নগরবাসীর প্রত্যাশা ও প্রশাসনের কার্যকারিতা দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।