News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

কিশোর গ্যাংয়ের দখলে নারায়ণগঞ্জের অলিগলি


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১০:০২ পিএম কিশোর গ্যাংয়ের দখলে নারায়ণগঞ্জের অলিগলি

বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। পড়নে হোসিয়ারির গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট। সঙ্গে থাকে একদল তরুণ। অনেকের পোশাক-আশাক ও চলাফেরাতেও থাকে একই ধরনের ছাপ। দলবেঁধে চলাফেরার পাশাপাশি কারও কারও হাতে থাকে দেশীয় অস্ত্র। সামান্য কোনো ঘটনা ঘটলেই দলবদ্ধ হয়ে হামলায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মারামারি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে এসব কিশোর-তরুণ।

নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। তবে শহর ও আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এদের উপস্থিতি বেশি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন নামে গড়ে ওঠা এসব গ্রুপ নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনায় ব্যবহার করা হচ্ছে দেশীয় অস্ত্রও।

গত ২০ আগস্ট বন্দরের সালেহনগর এলাকায় কিশোর অপরাধী চক্র ‘সিফাত বাহিনী’র হামলায় ইসলামী যুব আন্দোলনের বন্দর থানা (পশ্চিম) কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জাহিদ আল আমিন ওরফে বুলবুল (৪০) নিহত হন। এ ঘটনায় সিফাত বাহিনীর বেশ কয়েকজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

এর আগে-পরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংকে ঘিরে নানা অভিযোগ রয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর রাতে রূপগঞ্জের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণ ওরফে ‘কুত্তা শ্রাবণকে’ গ্রেপ্তার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। একই অভিযানে তার তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

এসআরবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রাবণ ও তার বাহিনীর অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করলে তাকে টার্গেট করে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হতো। অভিযোগের খবর পেলেই তারা বাদীর বাড়িতে গিয়ে তাণ্ডব চালাত বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, বন্দর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সদর এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কিশোর গ্যাং বা অপরাধী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে কোনো কোনোটি নির্দিষ্ট এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সক্রিয়। আবার কিছু গ্রুপের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

ফতুল্লা এলাকায় স্থানীয়ভাবে আলোচিত কিশোর গ্যাং লিডারদের মধ্যে রয়েছে আরফান, রবিউল ইসলাম রানা, ইয়াদ, সামির, আশরাফ, আমির ওরফে ‘মুরগি আমির’, আমির, জিহাদ, মুন্না ও জুম্মান বাহিনী। সোনারগাঁয়ের তাজপুরে রয়েছে ‘সোহান বাহিনী’। বন্দরে ‘সিফাত বাহিনী’ এবং ফতুল্লায় ‘রোম গ্রুপ’ ও ‘রেজ্জাক বাহিনী’র নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত।

সদর থানার বিভিন্ন এলাকায় ‘আমির গ্রুপ’, নারায়ণগঞ্জ শহর ও সিদ্ধিরগঞ্জে ‘টেনশন গ্রুপ’ ও ‘ডেভিল এক্সা গ্রুপ’, সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে ‘শাহজালাল বাহিনী’র নামও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া গেছে।

বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকায় ‘আরিফুল গ্রুপ’, হাজারীবাগ এলাকায় ‘রাতুল গ্রুপ’, বন্দর বটতলায় ‘ফারদিন গ্রুপ’, সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজিতে ‘টাইগার গ্রুপ’, সুনীলপাড়ায় ‘আক্তার-জীবন-বিল্লাল-বাসেত’ গ্রুপ, সানারপাড়ে ‘ডংকু গ্রুপ’, কদমতলীর পাইন্দি ও নতুন মহল্লায় ‘সাদ্দাম গ্রুপ’, মুক্তিনগরে ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’ এবং হীরাঝিলে ‘সাইফুল গ্রুপ’ সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ ছাড়া ফতুল্লার ইসদাইরে ‘সোহরাব গ্রুপ’, কাপুড়াপট্টিতে ‘রকি গ্রুপ’ এবং সস্তাপুরে ‘আলমগীর গ্রুপ’সহ বিভিন্ন নামে আরও কয়েকটি কিশোরদের দল রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব নামের বাইরেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় আরও অনেক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একেকটি গ্রæপের সদস্য সংখ্যা খুব বেশি না হলেও কোনো ঘটনা ঘটলে তারা দ্রুত দলবদ্ধ হয়ে যায়। এ কারণে ছোটখাটো বিরোধও অনেক সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়। এলাকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিরোধও তৈরি হয়। এতে সাধারণ মানুষও আতঙ্কের মধ্যে থাকেন।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনে নানা কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পারিবারিক নজরদারির অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠের সংকট, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, মাদক এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রশ্রয় এসব বিষয়কে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিশোরদের একটি অংশ রাজনৈতিক কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে চলাফেরা করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধকর্ম, পুলিশের অকার্যকারিতা, সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার অভাব এবং কিশোরদের মোবাইল ফোনের অপব্যবহার চরম আকার ধারণ করেছে। এসব অপকর্মের পেছনে অতীতের মতো বর্তমানেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা বড় ভাইদের প্রশ্রয় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি কিশোরদের খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চায় যুক্ত করা, পরিবারের নজরদারি বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং এই তিন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। এ কারণে কিশোর গ্যাং নির্মূলে মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধেও বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।