নারায়ণগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও বন্ধ হচ্ছে না মাদকের স্পট। একের পর এক অভিযান, গ্রেপ্তার ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পরও শহর, শহরতলি ও বিভিন্ন উপজেলায় মাদক কারবারের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা মাদকের স্পটগুলো নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফলে শুধু মাদকসেবীদের আটক নয়, মাদক কারবারের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছেন। যোগদানের প্রথম রাতেই শহরের আলোচিত মাদক স্পট ও মদ বিক্রির এলাকায় অভিযান চালিয়ে শতাধিক মাদকসেবীকে আটক করা হয়। এরপর থেকে জেলার সাতটি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে।
সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর রাত থেকে ৩১ অক্টোবর রাত পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও ডিবি। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, স্কাফ, ফেয়ারডিল, বিয়ার ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও মাদকের স্পটগুলো বন্ধ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, মাদক কারবারের মূল নেটওয়ার্ক কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী, চোর ও ডাকাতদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, মাদক ও অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছে। পরিবার নিয়ে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছে সাধারণ পথচারীরা। চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসায়ীরাও স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ শহর, শহরতলি ও বিভিন্ন উপজেলার একাধিক এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত মাদক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশ ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। মাদকের আস্তানা চিহ্নিত করে সেগুলো উচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট কারবারিদের গ্রেপ্তারে জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতিবাদে নামতে হচ্ছে। চাঁদমারী এলাকায় মাদকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এলাকাবাসী প্রতিবাদ জানান। পরে বিকেলে সেখানে অভিযান চালিয়ে মাদকের স্পট ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম শহরে মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের একার পক্ষে এসব সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান তিনি।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান দীপু, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ এবং জেলা প্রশাসনও মাদকবিরোধী অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাদক নির্মূলে প্রশাসনের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। মাদক ব্যবসায়ীরা কোনো দলের নয়, তারা সমাজের শত্রু।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার স্বার্থে মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি।
অভিযান বাড়লেও প্রশ্ন মাদক স্পট নিয়ে :
পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ও বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের পরও নারায়ণগঞ্জে মাদকের স্পট বন্ধ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু মাদকসেবীদের আটক করে পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। মাদক সরবরাহকারী, পাইকারি কারবারি, অর্থের জোগানদাতা ও নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করতে হবে।
বিশেষ করে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, মাদকের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে নারায়ণগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন।
২৪ ঘণ্টায় ১৪০ গ্রেপ্তার, উদ্ধার বিপুল মাদক :
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৩০ অক্টোবর রাত থেকে ৩১ অক্টোবর রাত পর্যন্ত জেলার সাতটি থানা ও ডিবি পুলিশের বিশেষ অভিযানে মোট ১৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ২৯৫ পিস ইয়াবা, ৬১ বোতল স্কাফ, ৪৫ বোতল ফেয়ারডিল, ৬৩ ক্যান বিয়ার ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ জন মাদক কারবারি, ৮৮ জন মাদকসেবী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ১৯ জন, নিয়মিত মামলার ১৪ জন আসামি, একজন চোর, অন্যান্য মামলার চারজন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের একজন সদস্য রয়েছেন।
থানাভিত্তিক অভিযানে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে ফতুল্লা মডেল থানা এলাকায়। এ থানা পুলিশ মোট ৬৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে কাশিপুরের বাশমুলি এলাকা থেকেই আটক করা হয়েছে ৬২ জনকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুইজন মাদক কারবারি, ৫২ জন মাদকসেবী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ১০ জন, অন্যান্য ধারায় একজন এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের একজন সদস্য রয়েছেন। এ সময় ৬৩ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ৬১ বোতল স্কাফ, ৪৫ বোতল ফেয়ারডিল ও ২৭০ পিস ইয়াবাসহ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে সাতজন মাদক কারবারি, আটজন মাদকসেবী, দুজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এবং নিয়মিত মামলার আটজন আসামি রয়েছেন।
সোনারগাঁ থানা পুলিশ ১১ জন মাদকসেবী, একজন চোর ও একজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ২৫ পিস ইয়াবাসহ তিনজন মাদক কারবারি, সাতজন মাদকসেবী এবং নিয়মিত মামলার তিনজন আসামিসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ ছয়জন মাদকসেবী, একজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এবং নিয়মিত মামলার দুই আসামিসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বন্দর থানা পুলিশ ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ একজন মাদক কারবারি, একজন মাদকসেবী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত দুজন এবং অন্যান্য ধারায় তিনজনসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া আড়াইহাজার থানা পুলিশ তিনজন মাদকসেবী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত তিনজন এবং নিয়মিত মামলার একজন আসামিসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, জেলার সাতটি থানা ও ডিবি পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।






































আপনার মতামত লিখুন :