নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার গাবতলী পশ্চিম ইসদাইর টাগারপাড় এলাকায় অবস্থিত ইউনাইটেড অ্যাপারেল কম্পোজিট লিমিটেড অবিলম্বে চালু, শ্রমিকদের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের দুই মাসের বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ, চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর ) সকাল সাড়ে ১০টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে কারখানার শ্রমিকদের উদ্যোগে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে শ্রমিকরা শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে অবিলম্বে কারখানা চালু, বকেয়া মজুরি পরিশোধ এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
কারখানার শ্রমিক সাবিনা আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি আবু নাঈম খান বিপ্লব, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি সেলিম মাহমুদ, সহসভাপতি হাসনাত কবির, সহসাধারণ সম্পাদক নুর হোসেন সর্দার, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা সভাপতি রুহুল আমিন সোহাগ, গাবতলী-পুলিশ লাইন শিল্পাঞ্চল শাখার সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং কারখানার শ্রমিক লিটন, সুমন প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ইউনাইটেড অ্যাপারেল কম্পোজিট লিমিটেড কর্তৃপক্ষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ থেকে কারখানাটি বন্ধ করে রেখেছে। কোনো কার্যকর সমাধান ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কারখানা বন্ধ থাকায় কর্মরত শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের দুই মাসের বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করায় শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম আর্থিক ও মানবিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন। কারখানা বন্ধের ফলে শ্রমিকদের একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত ন্যায্য মজুরি থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
বক্তারা আরও বলেন, শ্রমিকরা প্রতিদিন কারখানায় শ্রম দিয়ে উৎপাদন সচল রাখেন। তাঁদের শ্রম, ঘাম ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করেই মালিকের ব্যবসা ও মুনাফা গড়ে ওঠে। অথচ মালিকপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবসায়িক সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তার দায়ভার শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা এবং তাঁদের পাওনা মজুরি আটকে রাখা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
নেতৃবৃন্দ বলেন, দুই মাসের বেতন না পাওয়ায় শ্রমিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া পরিশোধ, মুদি দোকানের বকেয়া বিল, চিকিৎসার ব্যয়, সন্তানের লেখাপড়ার খরচসহ পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক শ্রমিক ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও হারিয়েছেন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এভাবে শ্রমিকদের মজুরি আটকে রেখে তাঁদের পরিবারকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা কোনো সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।
নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রমিকরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা আদায় এবং কারখানা চালুর দাবিতে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিকেএমইএ এবং শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ ও আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর পরও শ্রমিকদের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করা হলে তাঁদের জীবন-জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বক্তারা বলেন, শ্রমিকদের মজুরি কোনো দয়া, অনুদান কিংবা মালিকের ইচ্ছাধীন বিষয় নয়; এটি শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আইনগত অধিকার। কারখানা পরিচালনায় আর্থিক বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলেও শ্রমিকদের আইনগত পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব থেকে মালিকপক্ষ অব্যাহতি পেতে পারে না। একই সঙ্গে কারখানা বন্ধ রাখা বা পুনরায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, চাকরির নিরাপত্তা ও আইনগত অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ শিল্পের অগ্রযাত্রায় শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ শিল্পের সংকটের কথা বলা হলে প্রায়ই শ্রমিকদের ওপর তার চাপ এসে পড়ে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে নিয়মিত মজুরি না পাওয়াÍএসব পরিস্থিতি শ্রমিকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের কর্মসংস্থান রক্ষা করা মালিকপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও প্রশাসনেরও দায়িত্ব।
সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ নি¤œলিখিত দাবিগুলো উত্থাপন করেন, ইউনাইটেড অ্যাপারেল কম্পোজিট লিমিটেড অবিলম্বে চালু করে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের দুই মাসের বকেয়া মজুরি অবিলম্বে সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে।
কারখানার সকল শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা ও নিয়মিত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাকরিচ্যুতির যেকোনো অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সকল আইনগত অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও পাওনা নিশ্চিত করতে হবে।
কারখানা চালু রাখা সম্ভব না হলে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সকল পাওনা ও আইনগত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হবে।
সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ মালিকপক্ষের প্রতি অবিলম্বে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার আহবান জানান। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিকেএমইএ এবং শিল্প পুলিশের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপ করে কারখানা চালু, বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।
তাঁরা বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা নিয়ে ছিনিমিনি বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে দাবি বাস্তবায়ন না হলে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান নেতৃবৃন্দ।








































আপনার মতামত লিখুন :