গত বছর ৩ আগস্ট ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনে হাস্যোজ্জল রূপে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন শামীম ওসমান- ‘আমি দেশেই আছি’। সরকার পতনের পর নিখোঁজ ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে এক মাস পর গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর রাতে শামীম ওসমানকে ভারতের দিল্লির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারে দেখা যায়। ওই সময় তিনি দিল্লীতে রয়েছেন এমন বার্তা পৌছাতে উপস্থিত কয়েক মিডিয়া কর্মী সাথে আলাপও করেন তিনি। হঠাৎ আত্মগোপনের পর গত বছর ১ অক্টোবর দুবাই বিমানবন্দরে স্ত্রী সালমা ওসমান লিপি সাথে দেখা গেছে শামীম ওসমানকে। ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের সূত্রে জানা গেছে, পলাতক ১ বছরের প্রায় ১০ মাস যাবৎ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগেই বাংলাদেশ থেকে পলাতক জীবনে চলে যান শামীম ওসমান। তিন মাসে তিন দেশে অবস্থানে শামীম ওসমান নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি হয়।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দালালদের সহযোগিতায় তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ওই সময় তিনি তার ছেলে অয়ন ওসমান ও জাতীয় এক নেতাও বর্ডার অতিক্রম করেন। পাশ্ববর্তী দেশ থেকে কিভাবে দুবাই গেলেন সেগুলো এখনো অজানা রয়েছে। একটি সূত্রে জানা গেছে, ভারত সরকারের কয়েকজনের সাথে শামীম ওসমানের যোগসাজশ রয়েছে।
এর আগে গত বছরের ৩ আগষ্ট ভোর থেকে সপরিবারে দেশ ছেড়েছেন প্রভাবশালী নেতা একেএম শামীম ওসমান শামীম ওসমানের সংাবদ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে অনলাইন মিডিয়াগুলোতে। এতে প্রতিবাদ জানিয়ে, ওই দিনই শামীম পুত্র অয়ন ওসমান একটি ভিডিও বার্তা দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড পেইজে। এটাই ছিল পরিবারের পক্ষে শেষ ভিডিও। বার্তায়, একটি বাড়ি বারিন্দা থেকে অয়ন ওসমান হাসি মুখে ভিডিও বার্তায় প্রশ্ন রাখেন, ‘এইটা যদি থাইল্যান্ড হয়, তা হলে ঢাকা কোথায়?’ ভিডিও-এর শুরুতেই সবাইকে সালাম ও সকালের শুভেচ্ছা জানান। এরপর বলেন, ‘আমি শুধু একটি কথাই জানতে চাই। এইটা যদি থাইল্যান্ড হয়, তাহলে ঢাকা কোথায়?’ এছাড়া তিনি ক্যাপশনে দাবি করেন, সপরিবারে দেশ ছাড়ার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও গুজব। দেশটাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি জানান।
এর এক মাস পর গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের দিল্লির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারে দেখা মিলল শামীম ওসমানের। ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আকাশ হক তাকে মাজারে দেখেছেন। রাত ৯টা ৫ মিনিটে শামীম ওসমানের ছবি তুলেছেনও তিনি। ছবিতে দেখা গেছে, শামীম ওসমান গাঢ় গোলাপি রঙের হাফ হাতা একটি শার্ট ও ছাই রঙের একটি প্যান্ট পড়ে মাজারের মূল বেদির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
১ অক্টোবর দীর্ঘ সময়ের পর দুবাই বিমানবন্দরে স্ত্রী সালমা ওসমান লিপি সাথে দেখা যায়। দুইজনই এয়ারপোর্ট বের হওয়ার পথের দিক ছুটেন। এরপর গাড়ী চালানো একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তারপর শামীম ওসমান একাধিকবার ভারতের দিল্লীতে আসা যাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে গত ২৫ জুলাই দুবাইয়ে শেখ জায়েদ মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে দেখা গেছে শামীম ওসমানকে। এর আগেও আমিরাতের আজমান সিটি সেন্টার আশেপাশে দেখা গেছে তাকে।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশে-বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ৫ আগস্টের পর পালিয়ে গেছেন নারায়ণগঞ্জের দুর্দর্শ প্রভাবশালী নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানও। ভাইরাল একটি ছবিতে দেখা যায়, শেখ হাসিনার অন্যতম এই লাঠিয়াল সানগ্লাস পরে মসজিদে চেয়ারে বসে নামাজ পড়ছেন। তার হাতে লাল সুতা বাঁধা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রতি ভারতে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার দরগাতে তিনি এই সুতা হাতে বেঁধেছেন।
প্রবাসী সাংবাদিক নাজমুস সাকিব তার এই ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘খেলা হবে’ খ্যাত ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্যতম লাঠিয়াল নারায়ণগঞ্জের গডফাদার শামীম ওসমান বর্তমানে দুবাইতে পালিয়ে আছে। আজ শুক্রবার দুবাইয়ের শেখ জায়েদ মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ার সময় এভাবেই ক্যামেরাবন্দি হন পলাতক হাসিনার এই দোসর।
শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের মাধ্যমে জানা যায়, ‘শাহ নিজাম, আহমেদ কাউসার, হাবিবুর রহমান রিয়াদসহ অপেক্ষাকৃত বিশ্বস্ত এবং ওসমান পরিবার যাদের ব্যবহার করে অনেক বেশি অপকর্ম করেছিল, তাদের দুবাইয়ে আনার যাবতীয় উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। দুবাইয়ে ব্যবসা ও চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন মর্মে তাদের নেওয়া হচ্ছে দুবাইয়ে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন দুবাই পৌঁছে গেছেন বলেও জানা যায়। বাকিদেরও সেখানে পাঠানোর জন্য চলছে তোড়জোড়। তবে দুবাইয়ে বর্তমানে ভিসা কড়াকড়ির মধ্যেও কীভাবে তার ব্যবস্থা হচ্ছে সে বিষয়টি এখনও জানা যায়নি।’
সূত্র বলছে, ‘শামীম ওসমানের অপকর্ম যেন আদালতে বা কোনো জবানবন্দিতে রেকর্ড না হয় সে জন্য সবাইকে দেশ থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা এঁটেছেন তিনি। বিশেষ করে অস্ত্রের মহড়ায় যারা জড়িত তাদের নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে তার। যেই সোর্স ব্যবহার করে তিনি দেশ ছেড়েছেন, সেই সোর্স ব্যবহার করেই তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের দেশ থেকে বাইরে নিয়ে আসতে চাইছেন। যৌথ বাহিনীর অভিযানে ঘনিষ্ঠদের কেউ গ্রেপ্তার হলেই বেরিয়ে আসবে তার সব তথ্য। আর সেই ভয়েই অর্থ খরচ করে তাদের ভিসা, প্লেনের টিকেটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন তিনি।’
ক্ষুব্ধ নগরবাসী বলছেন, একদিকে অর্থের প্রভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে পেরেছেন শামীম ওসমান ও তার পরিবার। এখন অন্তর্বতীকালীন সরকারের আমলেও যদি তার অনুসারীদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে এই শহরের নিপীড়িত মানুষ ন্যায় বিচার পাবে না। অনতিবিলম্বে এই অপরাধীদের বিদেশ গমন ঠেকাতে হবে এবং দ্রæত আইনের আওতায় আনতে হবে। যেকোনো মূল্যে তাদের ইমিগ্রেশন অতিক্রম এবং সীমান্তে অবৈধ পারাপার ঠেকাতে হবে। এর আগে, গত বছর ১৯ জুলাই ছাত্র আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, শামীম ওসমান ও তার কয়েকশ অনুসারী আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে শহরের চাষাঢ়া এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কে শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকার দিকে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দিচ্ছেন। তার সঙ্গীদের কয়েকজন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিও ছোড়েন তারা।
আপনার মতামত লিখুন :