নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রী সেলিনা হায়াৎ আইভী কারাগারে বন্দি রয়েছেন আজ তিন মাস (৯০দিন)। বিশ বছর বেশি সময়ে ধরে টানা নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্ষমতাসীন এই নেত্রী বিএনপির চারদলীয় জোট, ১/১১, আওয়ামী লীগ তিনবারের ও অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দায়িত্ব পালন ছিলেন কঠোর। ওসমান পরিবারের বিরোধীতা করা নিয়ে আইভীকে নারায়ণগঞ্জ সহ সারা বিশ্ব মানুষ এক নামে পরিচিত। তার সুবাদে ২০১১, ২০১৬ ও ২০২২ সালের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হন আইভী।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা আন্দোলনে মাধ্যমে টানা আওয়ামী লীগ সরকারকে পতন করে ছাত্র-জনতা। গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় তার সরকারের স্পিকার মন্ত্রী হুইপ এমপি ও দলীয় নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু নাসিক মেয়র ডা. আইভী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শাহাদাৎ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে সমালোচনা জড়িয়ে পড়ে। এতে নারায়ণগঞ্জ সহ বিভিণœ স্থানে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে মেয়র কাউন্সিলর ও জেলা উপজেলা চেয়ারম্যানগণের অপসারণ করা হয়। যার ফলে গত বছর ১৯ আগস্ট সিটি কর্পোরেশন থেকে অপসারণ হয়ে ক্ষমতাচ্যুত স্বাদ গ্রহণ করেন।
অপসারণের পর ছাত্র-জনতা হতাহত ঘটনায় মামলা আসামি হন আইভী। গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে না গিয়ে নিজ বাড়ি চুনকা কুটিতে অবস্থান নেন। প্রায় সাড়ে আট মাসের বেশি সময় ধরে নিজ বাড়িতে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের আনাগোনা ছিলো সর্বত্রক। কিন্তু ৭ মে হঠাৎ চিকিৎসা জন্য দেশের বাহিরে যান সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর হামিদ। এতে পুরো দেশ জুড়ে তুমুল আলোচনা সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে ৯ মে নাটকীয় মোড় নিয়ে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হন আইভী।
ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নিহত মিনারুল ইসলাম, হকার নাদিম, তুহিন, রাকিব হত্যা ও আহত সাঈদের মামলা আসামী হয়ে গ্রেপ্তার হন আইভী। এরপর জুন মাসে সজল হত্যা মামলা দায়ের করা হলে আইভীকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায় পুলিশ। সূত্রে জানা গেছে, রাকিব হত্যায় ৭ নম্বর, তুহিন হত্যায় ১১নম্বর, নাদিম হত্যায় ৯ নম্বর, মিনারুল হত্যায় ১২নং ও আহত সাঈদ হত্যা চেষ্টা মামলায় ৬ নম্বর হিসেবে আইভীর নাম রয়েছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে ছয় মামলায় জামিন চাওয়া হলেও নামঞ্জুর করেছে বিচারক। এতে করে হাইকোর্ট থেকে ইতোমধ্যে একাধিক মামলায় জামিন চুপসে আছেন। সরকারের ক্লিয়ারেন্সে পেলে বাকি মামলার জামিন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ফিরতে চান আইভী। অন্যদিকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে নেয়াকালে হামলার মামলা একাধিক সমর্থকদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে রয়েছে। বাকি মামলা আসামিরাও আত্মগোপনে রয়েছেন গ্রেপ্তার এড়াতে।
প্রায় ৬ ঘণ্টা চেষ্টার পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। গত ৯ মে ভোর ৬টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় আইভীর বাড়ির সামনে বিপুলসংখ্যক সমর্থক অবস্থান করছিলেন। পুলিশের ভ্যানে ওঠার আগে আইভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি জানি না আমাকে কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে জানিয়েছে প্রশাসন, কিন্তু আমাকে দেখাতে পারেনি। আমি ২১ বছর সকল কিছুর উর্ধ্বে থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীকে সেবা দিয়েছি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলা যদি অপরাধ হয়, তাহলে আমি সেই অপরাধে অপরাধী হতে চাই।’
আইভী বলেন, ‘আমি কি কোনো জুলুমবাজ? আমি কি হত্যা করেছি? আমি কি চাঁদাবাজি করেছি? নারায়ণগঞ্জ শহরে আমি কোনো দিন কোনো বিরোধী দলকে আঘাত করেছি, এমন রেকর্ড আছে? তাহলে কিসের জন্য, কোন ষড়যন্ত্রের কারণে, কার স্বার্থে আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো? আমিও প্রশাসনের কাছে জানতে চাই। বর্তমান যারা সরকারে আছেন, তারা সাম্যের কথা বলেছেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপনারা আন্দোলন করেছেন, সরকারকে হটিয়ে নতুন সরকারে এসেছেন- তাহলে কী এই বৈষম্য? তাহলে সৎ রাজনীতি, সততার কী মূল্যায়ন? আমি তো বাড়িতেই ছিলাম, পালাইনি। তাহলে এভাবে আমাকে গ্রেপ্তার করতে হলো কেন? সেই জবাব জনগণের কাছে চাই, জনগণই দিবে। ইনশাল্লাহ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’
স্থানীয়রা জানায়, গত বছর ৫ আগস্টের পর এই প্রথম ৮ মে বিপুলসংখ্যক পুলিশের একটি বহর সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়িতে আসে। এ সময় এলাকাবাসী পুলিশ আসার খবর পেয়ে বাড়ির চারপাশে অবস্থা নিতে শুরু করে। পরে আশপাশের মসজিদগুলো থেকে পুলিশ আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত মানুষ এসে বাড়ির আশপাশের কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে।
এলাকাবাসী জানায়, সাবেক মেয়র আইভী স্থানীয়দের মধ্যে জনপ্রিয়। তাই স্থানীয়রা এই পুলিশি অভিযান প্রতিহত করতে সড়কে নেমেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :