নারায়ণগঞ্জ শহরে চাঁদাবাজি পুরোনো সমস্যা হলেও দিন দিন আরও ঘনিভূত হচ্ছে। পরিবহন স্ট্যান্ড, ফুটপাতের ভাসমান দোকান, মার্কেট ইত্যাদি থেকে প্রতিনিয়ত চলছে চাঁদাবাজি। তবে চাঁদাবাজির সাথে সাথে যানজট বৃদ্ধি পাওয়ায় অসহনীয় হয়ে উঠছে নগরবাসী। এমন অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে ব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে আবেদন রেখেছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট মুস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপুর নিকট।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) চেম্বার অব কমার্সের মত বিনিময় সভায় দিপু ভুঁইয়াকে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় শুভেচ্ছা জানান এবং তার কাছে এই আবেদন রাখেন। এসময় ব্যবসায়ীরা প্রধান দাবি তোলেন শহর থেকে চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য। সেই সাথে এই বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার জন্যেও আহবান জানান ব্যবসায়ী নেতারা।
মতবিনিময় সভায় হোসিয়ারি এসোসিয়েশনের সভাপতি বদিউজ্জামান বদু বলেন, ‘এই শহরে কে চাঁদা তোলে ফুটপাত থেকে সেটা সবাই জানে। দুদিন পরপর লাঠি নিয়ে উঠিয়ে দেয় আবার বসায়। এই নাটক বন্ধ করা উচিৎ। এই বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।’
মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আব্দুস সবুর খান সেন্টু বলেন, ‘আমরা চাঁদা তুলে খাই না। বরং ট্যাক্স দিয়ে চলি। চাঁদাবাজ যত বড় শক্তিশালী হোক, তাকে রুখতে হবে। আমি লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিবো, আর পকেটে চাঁদা নিবো। এটা আর হবে না। আপনি এই মাটির সন্তান, এই নারায়ণগঞ্জের সন্তান। নারায়ণগঞ্জ শহরে সদর-বন্দরের এমপি আবুল কালাম ও আপনি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন। তাহলে নারায়ণগঞ্জ শহরকে চাঁদামুক্ত করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করবো।”
নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানা বলেন, সুতা ব্যবসায়ীদের ট্রাক রাতের বেলা শহরে ঢুকলে পুলিশ ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়। ১৯৯৪ সালেও পুলিশ এ ধরনের টাকা নিত। সে সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে বিষয়টির সমাধান করেছিলেন এবং নির্দেশ দিয়েছিলেন—পুলিশ কোনো টাকা নেবে না এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি করবে না। কিন্তু সেটা এখন হচ্ছে। এই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’
এদিকে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি সহ সব ধরনের অপকর্ম বন্ধের আশ্বাস দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের এমপি আবুল কালাম। তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি যেহেতু রাজনৈতিক দল করি, নাম ভাঙিয়ে সুবিধাবাদী একটি গ্রুপ আমাদেরকে হাতিয়ার বানিয়ে অনেক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করছে, করবে। বিএনপি, আমার, পরিবারের সদস্য বা নেতাকর্মীদের নাম ব্যবহার করে যদি কখনো আপনাদের কাছে অনৈতিক বা বেআইনি কোনো বিষয় আসে, তাহলে এক মিনিটেরও দুর্বলতা দেখাবেন না। আমার কোনো ফোন কখনো পাবেন না—নিশ্চিত থাকবেন।”
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগ থেকে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছেন নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের এমপি আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নই। কেউ কোনো অনৈতিক কাজে বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে তার দায় আমি নেব না। কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও থানাকে তিনি স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আমি প্রশ্রয় দিব না। অপরাধী ও অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। আমার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অপরাধমূলক কাজে জড়াতে চায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি।’
সবশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়া মহানগর বিএনপির আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান দায়িত্ব প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ এখন যেন একটি অটোরিকশার শহরে পরিণত হয়েছে। মানুষ কোথাও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। স্বাস্থ্যগত অবস্থাও খুব খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথমেই ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামত, ধুলাবালি থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করা, হকার ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ এবং যানজট সমস্যার সমাধানকে আমি অগ্রাধিকার দেব। এজন্য আমি ৫০ থেকে ৬০ দিনের একটি কর্মসূচি হাতে নেব। এই সময়ের মধ্যেই সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
মূলত হকার ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রকের পেছনে চাঁদাবাজদের বড় একটি হাত রয়েছে। সেই সমস্যা সমাধান করার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চার ব্যক্তি যদি স্ব স্ব অবস্থান থেকে এগিয়ে আসেন, তাহলে শহর থেকে চাঁদাবাজি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব। কারণ এই চারজনই শহরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসে আছেন। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।


































আপনার মতামত লিখুন :