নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ও বিতর্কিত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শামীম ওসমানকে ঘিরে ফের আলোচনার ঝড় উঠেছে। এক সময় ‘গডফাদার’ খ্যাত এই আওয়ামী লীগ নেতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ ছাড়লেও তার অনুসারীরা এখনও এলাকায় সক্রিয়। নির্বাচনে প্রচার প্রচারণা ও আপোষের মাধ্যমে এলাকায় ফেরার সুযোগ তৈরী হলেও বিষ্ময়কর ফলাফলে হতাশ অনুসারীরা।
ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওসমান-ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী প্রকাশ্যে দলীয় পরিচয় বদলালেও ভেতরে ভেতরে নিজেদের নেটওয়ার্ক অটুট রেখেছেন। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানারে মিশে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির কাসেমীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা যায় ওসমানপন্থী কয়েকজন পরিচিত মুখকে। অন্যদিকে, ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলীর পাশেও অবস্থান নেন তাদের কেউ কেউ। আওয়ামী নেতাকর্মীদের ভাষ্য, “দুজনের যেই জিতুক, ফের যেন তারা ফতুল্লার মাটিতে ফিরে আসতে পারে দাপটের সাথে। বিনিময়ে নিশ্চিত করবে প্রার্থী দুজনের বিজয়ের মাঠ।” মন হিসাবেই তারা সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং বিএনপির নেতাকর্মীরাও ভোটের হিসেব কষে চুপ ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান-ঘনিষ্ঠদের একটি অংশের বিশ্বাস ছিল—কাসেমী বা মোহাম্মদ আলী বিজয়ী হলে এলাকায় তাদের জন্য পথ সহজ হবে। এতে দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয় ফের শক্তিশালী করার সুযোগ মিলতে পারে। বিশেষ করে ফতুল্লা এলাকায় আগের মতো প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন দেখছিলেন অনেকে। কারও কারও কাছে শোনা যায়, কাসেমীকে জেতাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন শামীম ওসমান। কিন্তু তার ভেঙ্গে পড়া সাম্রাজ্যের সৈনিকরা হাতেগোনা মাত্র। যাদের দিয়ে ভোট ডাকাতি ছাড়া জয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এক স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শামীম ওসমান না থাকলেও তার লোকজন আছে। তারা অপেক্ষায় ছিল—কেউ জিতলেই আবার বিএনপির সাথে হাত মিলিয়ে বিসিক সহ শিল্প নগরীতে হাত দিবে। ব্যবসা বাণিজ্যে ভাগ বসাবে। এভাবেই তারা ফেরার চেষ্টা করছিলো। অন্যদিকে গিয়াস উদ্দিন, শাহ আলমের বলয়কে চাপে রাখতেই তাদের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছিলো।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই হিসাব মিলেনি। এনসিপির তরুণ প্রার্থী আবদুল্লাহ আল আমিনর অপ্রত্যাশিত বিজয়ে বদলে গেছে পুরো সমীকরণ। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ তার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় নির্বাচনের ফলাফলে চমক দেখা যায়। এনসিপির নেতাকর্মীরা বলছেন, “জনগণ পুরোনো প্রভাব ও গডফাদার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি নতুন রাজনীতির সূচনা।”
ফল ঘোষণার পর ওসমান-অনুসারীদের মধ্যে হতাশা লক্ষ্য করা গেছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের। তাদের অনেকেই এখন ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এবারের ফলাফল কেবল একটি আসনের পরিবর্তন নয়। এটি দীর্ঘদিন শামীম ওসমানের প্রভাব-নির্ভর রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি বার্তা। তবে বিরোধী দলের এমপি হিসেবে আবির্ভুত হওয়া আব্দুলাহ আল আমিনের নেতৃত্বে ওসমানদের ছায়া নেটওয়ার্ক কতটা টিকে থাকবে বা কতটা ভাঙবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
































আপনার মতামত লিখুন :