News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২

কাসেমী ও ফেরদাউসের দুই গ্রুপ : জমিয়তে সংঘাতের শঙ্কা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১১:১৮ পিএম কাসেমী ও ফেরদাউসের দুই গ্রুপ : জমিয়তে সংঘাতের শঙ্কা

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যেন চরম আকার ধারণ করেছে| নেতাকর্মীরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন| নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং গোপন কর্মী সম্মেলন আয়োজনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে| আর এসকল নেতাকর্মীরা যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে পারেন|

এরই মধ্যে একটি পক্ষের সম্মেলন আয়োজনকে কেন্দ্র করে আরেক পক্ষের বাধায় পন্ড হয়েছে| এদিন তাদের মধ্যে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃস্টি হয়েছিলো| পরবর্তীতে একটি পক্ষ পিছু হঠায় পরিস্থিতি শান্ত হয়| তবে ওইদিনের পিছু হঠা পক্ষটি আবারও যে কোনো সময় সুযোগ বুঝে আক্রমণাত্বক হয়ে যেতে পারেন| বিপরীতে বাধা দেয়া পক্ষটিও ছাড় দিবেন না কোনোভাবেই| সবমিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্তিতি বিরাজ করছে|

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা জমিয়তে উলামা ইসলামের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমীর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও মহানগর কমিটি পরিচালিত হয়ে আসছিল|

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জেলার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ফেরদৌসুর রহমান, মহানগরের সভাপতি কামাল উদ্দিন দায়েমী ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মনোয়ার হোসাইন পৃথকভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন| তারা মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিল আয়োজন করেন| যা নিয়ে জমিয়তে উলামা ইসলামের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়|

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমে জেলা ও মহানগরের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে অবহিত করা হয়নি এবং কেন্দ্রীয় নেতাদেরও একপাক্ষিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়| বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলে মনির হোসেন কাসেমী নিজেকে এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান| পরবর্তীতে নেতাকর্মীদের দাবির মুখে একটি নির্ধারিত কাউন্সিল স্থগিত করা হয়|

এরপরও সংশ্লিষ্ট নেতারা কার্যক্রম চালিয়ে গেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে মাওলানা ফেরদৌসুর রহমান ও কামাল উদ্দিন দায়েমীকে শোকজ করা হয়| কিন্তু শোকজের পরও তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের ভিন্নভাবে অবহিত করে গোপনে ৯ এপ্রিল হীরা কমিউনিটি সেন্টারে কর্মী সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা করেন| কিন্তু এই বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেননি জেলা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মুফতি হারুনুর রশিদের নেতৃত্বাধীন জমিয়তের নেতাকর্মীরা|

পরবর্তীতে জেলা ও মহানগরের নেতারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সম্মেলনটি প্রতিরোধ করেন| এ সময় জেলা সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজ, জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম আলী, সাইনবোর্ড জোন সভাপতি ওসমান গনী, ফতুল্লা থানা সিনিয়র সহসভাপতি হাফেজ হানজালা, থানা সহসভাপতি নজরুল ইসলাম, থানা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক  মুফতি মাহমুদুল হাসান থানা সহসাংগঠনিক আনিসুর রহমান ছানি এবং সহ-দপ্তর সম্পাদক ফয়সাল ইবনে মাহফুজ নেতৃত্ব দেন|

নেতাকর্মীরা জানান, তারা হীরা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে পৌঁছালে আয়োজকরা পরিস্থিতি বুঝে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে  যান| পরে  মাওলানা ফেরদৌস, সাবেক মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা মনোয়ার হোসেন হিরা কমিনিউটির সামনে আসলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হলে, দায়িত্বশীলরা তাকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করিয়ে দেয়|

এর আগে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাউন্সিলের উদ্যোগ নেওয়ায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়| একইসঙ্গে ৯ই এপ্রিল প্রস্তাবিত কাউন্সিল স্থগিত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়| জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মুফতী মনির হোসাইন কাসেমী ¯^াক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়|

কিন্তু এ শোকজ নোটিশকে ভূয়া বলে দাবী করেছেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান| তিনি বলেন, আমার কাছে কোনো নোটিশ প্রদান করা হয়নি| নোটিশের জন্য যে দলীয় প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে এটা আমাদের দলীয় প্যাড না| সেই সাথে এ বিষয়ে আমার সাথে কেউ যোগাযোগ করেনি|

সেই সাথে এই শোকজ নিয়েই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলামা ইসলামের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন| সবশেষ ১১ এপ্রিল আড়াইহাজার উপজেলায় কর্মী সম্মেলন করেছেন| কিন্তু তাদের এই কার্যক্রমকে মেনে নিতে পারছেন না জেলা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মুফতি হারুনুর রশিদের নেতৃত্বাধীন জমিয়তের নেতাকর্মীরা| তারাও পাল্টা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করছেন|

এর আগে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হেফাজত প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজধানীর পাশ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতাকর্মীরা আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছিলেন| ঢাকার পাশপাশি নারায়ণগঞ্জের রাজপথও তারা সরব রেখেছেন| রাজধানীর প্রবেশপথ কাঁচপুর মহাসড়কে তারা সহিংসতা চালিয়েছেন| হেফাজতের প্রতিটি কর্মসূচিতের তারা সরব ভূমিকা পালন করেছেন|

সেই সাথে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম ব্লগার আহম্মেদ রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যার ঘটনায় তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া গোল চত্বরকে ‘রাজীব চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়| ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চাষাঢ়ায় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ, রাজাকারদের ফাঁসির দাবি ও ব্লগার রাজীব হত্যার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশের আগে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড গেঁথে দেন এবং ফলক উন্মোচন করেন|

কিন্তু সেই ‘রাজীব চত্বর’ ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই শহরের ডিআইটি এলাক থেকে মিছিল নিয়ে এসে রাজীব গুড়িয়ে দেয়া হয়| যে মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন হেফাজতের নেতাকর্মীরা|

এরপর ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানী ঢাকায় শাপলা চত্ত্বর কায়েম করা হয়| আর এই শাপলা চত্ত্বরে ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের নেতারা সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন| এভাবে একের পর এক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতাকর্মীদের সাথে ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিদের নজর কাড়ে| তাদের যে কোনো কর্মসূচিতেই সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা অংশগ্রহণ করেন|

তবে এই আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন| বিভিন্ন সময় তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতাও পরিরক্ষিত হয়| ২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ| সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান| এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে স¤ে^াধন করেছিলেন| যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো|

এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে| স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন| পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে| এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার|

ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা| ওই বছরের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়| সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন| সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন|

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও ¯^াধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়| নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমš^য়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেছিলেন|

২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মসজিদ ভেঙে শপিংমল ও মাদ্রাসা উচ্ছেদ করে পার্ক করার অভিযোগ এনে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ| এদিন জুমার নামাজের পর শহরের চাষাঢ়া এলাকার বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে এই সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন|  

এভাবে একের পর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ফেরদাউসের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে আখ্যা পান| মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান মহানগর হেফাজত ইসলামকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন| আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এ নিয়ে কেউ কিছু বলতেন না|

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই ফেরদাউসকে নিয়ে হেফাজত ইসলামের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়| সেই সাথে ফেরদাউসও এককভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছেন| আর এই নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে এবার নিজেদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পরছে|