News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩

শামীম ওসমানের সহযোগিতায় ভারত পালিয়ে যান নূর হোসেন


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১০:২৩ পিএম শামীম ওসমানের সহযোগিতায় ভারত পালিয়ে যান নূর হোসেন

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন নূর হোসেন। হত্যাকা-ের পর নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন শামীম ওসমান। ওই সময়ে নূর হোসেনের সঙ্গে তখনকার এমপি শামীম ওসমানের টেলিফোন কথোপকথনে উঠে আসে বিষয়টি। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সাতজনকে অপহরণের পর ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে শামীম ওসমানকে ফোন করেন নূর হোসেন। দুই মিনিটের মতো কথা হয় তাঁদের মধ্যে।

শামীম ওসমানকে ফোন করেন নূর হোসেন। তিনি ফোন ধরে বলেন, ‘খবরটা পৌঁছাই দিছিলাম, পাইছিলা?’ জবাবে নূর হোসেন বলেন, ‘পাইছি, ভাই।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি অত চিন্তা করো না।’

নূর হোসেন এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামীম ওসমানকে বলেন, ‘ভাই, আমি লেখাপড়া করিনি। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন। আপনারে আমি অনেক ভালোবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’

কথোপকথনের এই পর্যায়ে নূর হোসেনের কাছে শামীম ওসমান জানতে চান, কোনো সিল (সম্ভবত ভিসা) আছে কি না। সিল থাকার কথা জানিয়ে নূর হোসেন বলেন, ‘আছে আছে, সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে? যেভাবে বলল অ্যালার্ট (রেড অ্যালার্ট)।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি আগাইতে থাক।’ নূর হোসেন তখন বলেন, ‘ভাই, তাহলে একটু খবর নেন। আমি আবার ফোন দেই।’

কথাবার্তার একপর্যায়ে শামীম ওসমান নূর হোসেনকে বলেন, ‘তুমি কোনো অপরাধ করো নাই। আমি জানি, ঘটনা অন্য কেউ ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারতেছে।’

শামীম ওসমান নূর হোসেনের কাছে জানতে চান, এই নম্বরটি (ফোন) নতুন কি না। নূর হোসেন ‘হ্যাঁ সূচক’ জবাব দেন। শামীম ওসমান বলেন, তিনি নূর হোসেনকে তাঁর আরেকটি নম্বর পাঠাবেন যোগাযোগের জন্য।

তদন্তকারী সংস্থার সূত্র দাবি করছে, এরপর নূর হোসেন দেশ ছাড়ের। আগের দিন ২৮ এপ্রিলও নূর হোসেন সারা দিন সিদ্ধিরগঞ্জে ছিলেন। ২৮ এপ্রিল গভীর রাতে ঢাকায় চলে আসেন এবং গুলশান এলাকায় অবস্থান করেন। ২৯ এপ্রিল রাত নয়টায় ধানমন্ডিতে অবস্থান করার সময়ই শামীম ওসমানের সঙ্গে কথা বলেন নূর হোসেন। এর পর থেকে তিনি নিজের ফোন বন্ধ রাখেন। ধারণা হচ্ছে, ওই রাতেই তিনি ভারতে চলে যান।

শামীম ওসমান ‘গৌর দা’ বলে এক লোকের সঙ্গে নূর হোসেনকে দেখা করতে বলেন।কথাবার্তার এক পর্যায়ে শামীম ওসমান গৌরদা’র সঙ্গে দেখা করতে বলেন নূর হোসেনকে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গৌরদা’ই হয়তো নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলো।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম সহ সাত জনকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এরপর ৩০ এপ্রিল ৬ জন ও ১ মে আরেক জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ভয়াবহ ঘটনাটির পর থেকে আত্মগোপনে থাকা নূর হোসেন পালিয়ে চলে যায় ভারতে। ২০১৫ সালের ১৪ জুন ভারতের কলকাতায় ৩ সহযোগী সহ গ্রেফতার হয় সে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

অনুসন্ধানে ৩ জন সম্ভাব্য ‘গৌরদা’র কথা জানা যায়। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মানব পাচারের অভিযোগ আছে।

গৌর সেন : যশোর শহরের টিবি ক্লিনিক রোডের সাবেক বাসিন্দা গৌর সেনের বাবার নাম জীবন সেন (জীবন মুহুরী)। ১৯৮০ সালে ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় গৌর সেন একই শহরের ষষ্ঠীতলা পাড়ার সন্ত্রাসী আলমাসকে হত্যার চেষ্টা করে। ১৯৮৪ সালে ওই মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেন। ১৯৯৪ বা ’৯৫ সালের দিকে মুক্তি পেয়ে আবার সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে গৌর সেন। এসময় যশোরের চাঁনপাড়ার বাচ্চু-রশীদের সন্ত্রাসী দলে যোগ দেয় সে। এক পর্যায়ে রশীদকে শহরতলির মুড়লীতে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে। তবে পরে বিরোধী পক্ষের হাতে খুন হওয়ার ভয়ে পালিয়ে যায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়ে গিয়ে গৌর সেন যোগ দেয় সেখানকার কুখ্যাত সমাজবিরোধী কালা সাহার দলে। তার সঙ্গে সিন্ডিকেট করে চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে। ২০০০ সালের দিকে প্রতিপক্ষ স্বপন সাহার দলের হাতে খুন হয় কালা। সে বছরই স্বপন সাহার এক বিশ্বস্ত সহচরকে খুন করে বনগাঁ ত্যাগ করে গৌর সেন। বর্তমানে সে পশ্চিমবঙ্গের চাকদহে বাস করে।

গৌর বিশ্বাস : দ্বিতীয় সম্ভাব্য ‘গৌরদা’ হলো গৌর বিশ্বাস। এই গৌর পেশাদার খুনি হিসাবে কুখ্যাত। একসময় বনগাঁর ঢাকাপাড়ায় থাকলেও বছর দশেক আগে বনগাঁ ছেড়ে শিলিগুড়ি চলে যায় সে। সেখানে গড়ে তোলে সন্ত্রাসী দল। কিছু দিনের মধ্যে পুলিশের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় নাম ওঠে তার। এক পর্যায়ে শিলিগুড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে গৌর বিশ্বাস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার ব্যাপারে কলকাতা পুলিশ বা বিএসএফ’র কাছে কোনও তথ্য নেই বলে জানিয়েছে বনগাঁর একটি সূত্র।

গৌর দত্ত : তৃতীয় জন গৌর দত্ত। লাকড়ির (জ্বালানি কাঠ) ব্যবসা করে জীবন শুরু করলেও এখন সে কোটি কোটি রুপির মালিক। থাকে বনগাঁর রেলবাজার এলাকায়। গৌর দত্তের বয়স প্রায় ৬০ বছর, গায়ের রং ফর্সা, উচ্চতা ৫ ফুট ৮/৯ ইঞ্চি, মাথায় টাক আছে। এখন কাঠের (লগ) ব্যবসা করে। বনগাঁ রেল বাজারের দিকে শ্বেতপাথরে তৈরি একমাত্র বাড়িটির মালিক সে। এক সময়ের সামান্য লাকড়ি ব্যবসায়ীর হঠাৎ করে এত অর্থবিত্ত এবং আলিশান বাড়ি নিয়ে বনগাঁ এলাকায় নানা কথা শোনা যায়। জানা গেছে, গৌর দত্ত মূল্যবান চন্দন কাঠের ব্যবসাও করে।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে হাজিরা শেষে প্রাইভেটকারযোগে ফিরছিলেন নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম। একইসময়ে আদালতের কার্যক্রম শেষে অপর একটি প্রাইভেটকারে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহীম। পথিমধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে সাদা পোশাক পরিহিত র‌্যাব সদস্যরা তাদের ৭ জনকেই অপহরণ করে। ৭ জনকে অপহরণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ। দফায় দফায় চলতে থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর চর ধলেশ্বরী এলাকা থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৭ জনকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় একই পন্থা ও কায়দা অবলম্বন করা হয়। নিহতদের মধ্যে সবাইকে একই স্টাইলে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। যাতে করে লাশ ভেসে উঠতে না পারে। উদ্ধার করা লাশের সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল, পেটে ছিল ফাঁড়া। ১২টি করে ইট ভর্তি সিমেন্টের বস্তার দুটি বস্তা বেঁধে দেয়া হয় প্রতিটি লাশের সঙ্গে। তাদের সবার লাশের মুখ ছিলো ডাবল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো।

মামলা চলাকালে প্রধান আসামীকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামীদের চোখ রাঙানি, নরঘাতকদের পক্ষে আদালতপাড়ায় শোডাউনসহ নানা ঘটনায় গেল আলোচিত ছিল ৭ খুনের মামলাটি। তদন্ত শেষে প্রায় এক বছর পর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দু’টি মামলায় নূর হোসেনসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। দু’টি মামলাতেই অভিন্ন সাক্ষী হলো ১২৭জন করে। যার মধ্যে দু’টি মামলার বাদি, দু’জন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১০৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারী সকাল ১০টা ৪মিনিট থেকে ১০টা ৯ মিনিট পর্যন্ত তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন আলোচিত ৭ খুন মামলার রায় ঘোষণা করেন। নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নাসিকের বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব:) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, উপ অধিনায়ক মেজর (অব:) আরিফ হোসেন ও ক্যাম্প ইনচার্জ লে. কমান্ডার (অব:) এম এম রানাসহ ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। বাকি ৯ জনের মধ্যে অপহরণ ও লাশ গুমের সঙ্গে জড়িত থাকায় এক আসামীকে ১৭ বছর, অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৬ জনকে ১০ বছর এবং লাশ গুমে জড়িত থাকায় ২ জনকে ৭ বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট সাত খুন মামলায় সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‍্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে যে ২৬ জনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালত তাদের মধ্যে প্রধান চার আসামী সহ ১৫জনের মৃত্যুদণ্ড তথা ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাকি ১১জনকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে।