News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

কাজে ফিরেছে গার্মেন্টস শ্রমিকেরা, কাটেনি মালিকদের উদ্বেগ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম কাজে ফিরেছে গার্মেন্টস শ্রমিকেরা, কাটেনি মালিকদের উদ্বেগ

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে গত কয়েকদিন ধরে শ্রমিক আন্দোলন পরবর্তী পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসছে। নারায়ণগঞ্জের প্রায় সব এলাকাতেই গার্মেন্টস শ্রমিকরা তাদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। সেই সাথে তারা শান্তভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ সহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ সহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় টানা তিন দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের প্রভাব পোশাকশিল্পে পড়বে বলে মনে করছেন মালিকরা। আন্দোলনের কারণে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সফরও বাতিল হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প মালিকেরা।

শিল্পমালিকদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খরচ এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। তবে আর কোনো শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি না হলে হয়তো পুষিয়ে নিতে পারবেন গার্মেন্টস মালিকরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো গার্মেন্টসে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়নি। তবে আন্দোলনের কারণে একেক কারখানা ভেদে ক্ষতির পরিমাণ আলাদা আলাদা হয়েছে। বিভিন্নভাবেই এই ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সব কারখানার ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমার কারখানায় ইংল্যান্ডের একজন নতুন ক্রেতার আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি হোটেল থেকে কারখানায় আসেননি। পরদিন আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতার কারখানা পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রধান কার্যালয় থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা পাওয়ায় তাঁরাও আসেননি। কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানার নয়, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ করে। বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি এমন পরিস্থিতি দেখলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে তাঁদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে। আমাদের দেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করবেন। কোনো দেশের ঝুঁকির মাত্রা যত বেশি হয়, সেই দেশে পণ্যের দাম তত কম দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।

নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৬২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মির্জা মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, আমাদের ৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। যে কোনো ধরনের অসন্তোষ এড়াতে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এর আগে গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের শুরুতে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলমান থাকলেও নারায়ণগঞ্জে শান্ত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের নামে শ্রমিকরা ভাঙচুর করা সহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খল কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিরব ভূমিকায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও আর শান্ত থাকেনি। গত ২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জেও গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। সেই সাথে জন সাধারণেরও ভোগান্তিও সৃষ্টি করেছেন।

এরপর মঙ্গলবার গত ৩ নভেম্বর গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে শিবু মার্কেট এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিলো। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছিলো। সংঘর্ষের সময় অবরোধে আটকে পড়া বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তারপর আবার ৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এদিন ফতুল্লার শিবু মার্কেট কাঠেরপুল এলাকায় এই ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় শ্রমিকরা পাল্টা ইটপাটকেল মারলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকবার শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন।

এদিকে এই আন্দোলনের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পিছনে তাদেরও অংশগ্রহণ ছিলো বলে ধরে নেয়া হয়েছে। সেই সাথে তাদের তৎপরতাকে দায়ী করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন বলেন, আমরা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মজুরিবোর্ড গঠনের দাবি তুলেছিলাম। ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে এই মজুরিবোর্ড একটা মজুরি নির্ধারণ করে ঘোষণা করবে। তখন যদি আমাদের মনমত না হয় তাহলে আমরা আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারি।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু মজুরিবোর্ড গঠন হয়েছে এখন অপেক্ষা করতে হবে। আজকে বললে কালকেই তো মজুরি ঘোষণা করতে পারবে না। আমরা এই জিনিসটি শ্রমিকদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা সেটা বুঝতেছে না তাদের মত করে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে। তাদের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল এখানে উস্কানি দিয়েছে। আমরা দেখছি পতিত সরকারের দোসর আছে সেই দোসরগুলো শ্রমিক সংগঠনের ভিতরে ঢুকে তাদের মধ্যে উস্কানি দিয়েছে। এটা বরদাশত করা হবে না। যারা সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে; যারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করবো। প্রত্যেক জায়গায় ক্যামেরা সেট করা আছে। ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করা আছে। আমরা দেখেছি তাদের খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা নিবো। আমরা সাধারণ শ্রমিকের সাথে আছি। সরকার তাদের বিষয়টি দেখবে।