শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। তারা শ্রমিকদের ওপর ভর করে নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সহ তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে উঠেছিলো। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নভাবে উসকিয়ে চেষ্টা করেছিলো।
আর তাদের এই উসকানিতে আওয়ামী লীগ সহ তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছিলেন। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পিছনে তাদেরও অংশগ্রহণ ছিলো বলে ধরে নেয়া হয়েছে। সেই সাথে তাদের তৎপরতাকে দায়ী করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ সহ তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুইটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যে দুই মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে প্রায় ১৮০০ জনকে। আর এই দুই মামলার সূত্র ধরে তাদেরকে আবারও ঘরছাড়া হতে হবে।
সবশেষ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় শিবু (৪২) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার এজাহারনামীয় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ ও শাহাদাত হোসেন সেন্টু, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি টিপু সুলতান, যুবলীগ নেতা আজমত আলী, মোফাজ্জল হোসেন চুন্নু ও ওয়াসিম, আওয়ামী লীগ নেতা মজিবর এবং ছাত্রলীগ নেতা সোহাগ ও সেলিম।
এ ছাড়া কুতুবপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখিত মিরু হোসেন ওরফে ল্যাংড়া মিরু, রঞ্জিত মÐল, সাবেক জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহীম চেঙ্গীস ওরফে চেঙ্গীস খান, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের নেতা অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মিজান, জেলা কৃষক লীগের সভাপতি নাজিম উদ্দীন সরদার, ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু শরিফুল হক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম, ইমরান হোসেন শুভ ওরফে চান শুভ এবং আল আমিন কবিরের নাম রয়েছে।
মামালার এজাহারে বলা হয়- পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চলমান আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন, অর্থায়ন ও পরিকল্পিত নাশকতার চেষ্টা ছিল। গত ৪ নভেম্বর কাঠেরপুল থেকে শিবু মার্কেট এলাকায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় এ মামলা করা হয়।
সেই সাথে এজাহারে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, দুই বাহিনীর সদস্যরা মোট ২০৩টি লং সেল, ৪৪টি শর্ট সেল, ২৪টি সাউন্ড গ্রেনেড, দুটি কালার স্মোক গ্রেনেড ও পাঁচটি টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেন। এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের পর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে সরে যান। পরে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় শিবুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ নভেম্বর সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে ফতুল্লার কাঠেরপুল, শিবু মার্কেট ও ইরান টেক্সটাইল এলাকার আবির ফ্যাশন, পলমল গার্মেন্টস, মাইক্রো ফাইবার, মেট্রো গার্মেন্টস, টাইম সোয়েটার ও মডার্ন গার্মেন্টসসহ আশপাশের বিভিন্ন শিল্পকারখানার প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শ্রমিক একত্রিত হয়ে কাঠেরপুল থেকে শিবু মার্কেট পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।
খবর পেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। প্রথমে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি অংশ সড়কে টায়ার সহ বিভিন্ন সামগ্রীতে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় অবরোধের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে সামনে আগোনোর চেষ্টা এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে বিভিন্ন যানবাহনের কাচ ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাধা দিলে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
এর আগে ফতুল্লায় পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের আড়ালে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং সংঘাত উসকে দেওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিলন ফকির বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়- বেতন বৃদ্ধির দাবিকে সামনে রেখে শ্রমিকদের সংগঠিত করার পেছনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ইন্ধন ও উসকানি ছিল। এর মাধ্যমে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সরকার উৎখাতের চেষ্টা এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার পরিকল্পনা ছিল।
এই মামলায় গ্রেফতারকৃতরা হলো- ফতুল্লা মডেল থানার লামাপাড়ার মফিজুল ইসলামের ছেলে মো. শামীম হাসান (২৮), কোতালেরবাগ বউ বাজার এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে মো. মামুন (২৬), ফতুল্লা রেলস্টেসন এলাকার বাচ্চু মিয়ার ছেলে মো. ওমর ফারুক (৩৮), রামারবাগ এলাকার ইমান তৌফিকের ছেলে ইমান ইমন (২৬), কোতালের বাগ এলাকার মৃত লিয়াকত হোসেনের ছেলে শাহিন আহম্মেদ ও কায়েমপুর এলাকার আক্তারুজ্জামানের ছেলে আতিকুর রহমান(২৫)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামিম বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের আড়ালে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং সংঘাত উসকে দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেফতারকৃতদেরকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলায় এজাহারনামীয় আসামীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- ফতুল্লার কাঠেরপুল এালাকর যুবলীগ নেতা আজমত আলী, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোস্তফা কামাল, কার্যকরী সদস্য মজিবর, নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি টিপু সুলতান, মোফাজ্জল হোসেন চুন্নু, রাকিব হোসেন, ওয়াসিম, রতন, মো. রাকিব, এবং ছাত্রলীগ নেতা সোহাগ ও সেলিমের নাম রয়েছে।
এর আগে গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের শুরুতে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলমান থাকলেও নারায়ণগঞ্জে শান্ত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের নামে শ্রমিকরা ভাঙচুর করা সহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খল কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিরব ভূমিকায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও আর শান্ত থাকেনি। নারায়ণগঞ্জেও গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। সেই সাথে জন সাধারণেরও ভোগান্তিও সৃষ্টি করেছেন।
এরপর মঙ্গলবার গত ১৩ নভেম্বর গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে শিবু মার্কেট এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিলো। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছিলো। সংঘর্ষের সময় অবরোধে আটকে পড়া বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তারপর আবার বুধবার নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এদিন ফতুল্লার শিবু মার্কেট কাঠেরপুল এলাকায় এই ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় শ্রমিকরা পাল্টা ইটপাটকেল মারলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকবার শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল এখানে উস্কানি দিচ্ছে। আমরা দেখছি পতিত সরকারের দোসর আছে সেই দোসরগুলো শ্রমিক সংগঠনের ভিতরে ঢুকে তাদের মধ্যে উস্কানি দিচ্ছে। এটা বরদাশত করা হবে না। যারা সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে; যারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করবো। প্রত্যেক জায়গায় ক্যামেরা সেট করা আছে। ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করা আছে। আমরা দেখেছি তাদের খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা নিবো। আমরা সাধারণ শ্রমিকের সাথে আছি। সরকার তাদের বিষয়টি দেখবে।
একই সাথে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু বলেছেন, এটা কোনো শ্রমিকের আন্দোলন না। ৩০ হাজার টাকা বেতন কোনো দাবী না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য সকলে মিলে চেষ্টা করছে।






















(5)-20261106124722.jpg)








(6)-20261106125255.jpg)


-20261104095621.jpg)





আপনার মতামত লিখুন :