নতুন আশা আর সীমাহীন আনন্দ নিয়ে একটি শিশুর আগমন মানেই একটি পরিবারের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ঘরের কোণে কোণে ভেসে ওঠে এক ধরনের নরম আলো, বাতাসে মিশে থাকে দুধের মিষ্টি গন্ধ আর অচেনা এক শান্তির অনুভূতি। সেই ক্ষুদ্র হাতের মুঠো, আধখানা চোখের মিষ্টি ঘুম, নরম ত্বকের উষ্ণতা আর নিঃশ্বাসের মোলায়েম শব্দ সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক আবেগের জগৎ, যার সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই ক্ষুদ্রতা বদলে যায়। বদলে যায় মুখের আদল, হাত-পায়ের গড়ন, এমনকি ঘুমের ভঙ্গিও। যে শিশুটি গতকাল দু’হাতের তালুতেই ধরা যেত, অল্পদিনের মধ্যেই সে হয়ে ওঠে চঞ্চল, দৃঢ় আর নিজের মতো করে বড় হতে থাকা এক নতুন মানুষ। ঠিক এই দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকা মুহূর্তগুলোকে স্থায়ী করে রাখার শিল্পের নামই নিউবর্ণ বেবি ফটোগ্রাফি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিউবর্ণ বেবি ফটোগ্রাফির চাহিদা গত পাঁচ থেকে সাত বছরে ধীরে ধীরে বেড়েছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। আগে যেখানে শিশুর ছবি তোলা মানে ছিল মোবাইল ফোনে তোলা কয়েকটি ঝলক, এখন সেখানে অনেক পরিবার আগেভাগেই পরিকল্পনা করে পেশাদার ফটোগ্রাফারের মাধ্যমে নিউবর্ণ ফটোশুট করাচ্ছেন।
এই পরিবর্তন একদিকে যেমন বাবা-মায়ের জন্য অমূল্য স্মৃতিকে সুন্দরভাবে সংরক্ষণের সুযোগ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে তরুণ ফটোগ্রাফারদের জন্য খুলে দিচ্ছে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার। অনেকেই এখন শুধুমাত্র নিউবর্ণ ও ম্যাটারনিটি ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
নিউবর্ণ বেবি ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠান ‘আগডুম বাগডুম’-এর কো-ফাউন্ডার সুজানা জাহেদী জানান, একটি শিশুর জন্মের পর ৫ থেকে ১২ দিন সময়টাই ফটোগ্রাফির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কেননা এই সময়টায় শিশুর ঘুম তুলনামূলক গভীর থাকে, শরীর থাকে স্বাভাবিকভাবে নমনীয় এবং মুখে থাকে এক ধরনের নিষ্পাপ কোমলতা, যা ক্যামেরার ফ্রেমকে করে তোলে আরও জীবন্ত ও আবেগময়।
চিকিৎসা ও শিশু-বিকাশবিষয়ক গবেষণাতেও দেখা যায়, জন্মের পর প্রথম দুই সপ্তাহে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে। ফলে তারা সহজে গভীর ঘুমে চলে যায়, অল্প নড়াচড়া করে এবং আলো বা শব্দে দ্রুত বিরক্ত হয় না। এই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোই নিউবর্ণ ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
নিউবর্ণ ফটোগ্রাফির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুর নিরাপত্তা ও আরাম নিশ্চিত করা। সামান্য অসতর্কতাও নবজাতকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কারণ এই সময়টায় শিশুর শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নাজুক।
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা ফটোশুটের আগে থেকেই নানা প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। স্টুডিওর তাপমাত্রা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে শিশুর শরীর ঠান্ডা না হয়ে যায়। ছায়াহীন ও নরম আলো ব্যবহার করা হয়, যাতে চোখে কোনো চাপ না পড়ে। ফটোগ্রাফিতে ব্যবহৃত কাপড়, কম্বল, টুপি, ঝুড়ি কিংবা অন্যান্য প্রপস অবশ্যই পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা হয় এবং সেগুলো শিশুর নরম ত্বকের জন্য নিরাপদ কি না, তা বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
সাধারণ বেবি ফটোগ্রাফি আর নিউবর্ণ ফটোগ্রাফির পার্থক্য
সাধারণ বেবি ফটোগ্রাফি ও নিউবর্ণ বেবি ফটোগ্রাফির মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। নিউবর্ণ শিশুকে কখনোই জোর করে কোনো ভঙ্গিতে বসানো বা শোয়ানো যায় না। শিশুর শরীর যে অবস্থায় স্বচ্ছন্দ বোধ করে, সেই স্বাভাবিক ভঙ্গিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই কারণে নিউবর্ণ ফটোগ্রাফি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের কাজ। একটি নিখুঁত ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, নীরবতা ও যত্ন।
প্রতিষ্ঠানটির চিফ ক্যামেরাম্যান ও কো-ফাউন্ডার ওমর ফারুক টিটু বলেন, নিউবর্ণ ফটোগ্রাফিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময় ও ধৈর্য। একটি শুট কখনো কখনো দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। কারণ শিশুকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, ডায়াপার বদলানো সবকিছুর মধ্য দিয়েই যেতে হয়।
তার মতে, এই সময় একজন ফটোগ্রাফার শুধু ক্যামেরা-চালক নন, অনেকটা একজন যত্নশীল অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করেন। ধৈর্য, সময় এবং গভীর মমতা এই তিনটি গুণই একজন ভালো নিউবর্ণ ফটোগ্রাফারের প্রকৃত পরিচয়।
শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়া, হাই তোলা, হঠাৎ মুচকি হাসি কিংবা হাতের আঙুল শক্ত করে মুঠো করার ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোই ছবিতে এনে দেয় প্রাণের স্পর্শ।
নিউবর্ণ ফটোগ্রাফি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিশেষ আলোকসজ্জা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীবাণুমুক্ত প্রপস, প্রশিক্ষিত সহকারী ও দীর্ঘ সময়ের শুটিং। এসব কারণেই এর বাজেট সাধারণ ফটোগ্রাফির তুলনায় কিছুটা বেশি হয়ে থাকে।
বর্তমান সময়ে নিউবর্ণ বেবি ফটোগ্রাফি শুধু বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা এবং স্বতন্ত্র শিল্পরূপে স্বীকৃত। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ফটোগ্রাফি একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নিউবর্ণ ফটোগ্রাফির ওপর আলাদা কোর্স করানো হয়। সেখানে শেখানো হয় কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, কী ধরনের আলো ব্যবহার করা উচিত, কোন ভঙ্গিগুলো শিশুর জন্য নিরাপদ, কীভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করতে হয় এবং কীভাবে ছবিকে পোস্ট-প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে আরও নান্দনিক করে তোলা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে এই শিল্পের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।
ঢাকা ও এর আশপাশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিউবর্ন ফটোগ্রাফি করছে। এর মধ্যে বেবিবর্ন ফটোগ্রাফি, এক্সপ্রেশন অ্যান্ড ফটো স্টুডিও, বেবি পিক্সেলস বাই টগুমগু, বিধানস ফটোগ্রাফি, বেবি আর্ট বাই রেজওয়ানা উল্লেখযোগ্য।









































আপনার মতামত লিখুন :