বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। এর ব্যতিক্রম নয় শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ। সাধারণত মে মাস থেকে সংক্রমণ শুরু হলেও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিই এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল, যা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে। ফলে প্রতিবছরই বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে একটি বড় জটিলতা হলো প্লাটিলেট কমে যাওয়া। ডেঙ্গু ভাইরাস অস্থিমজ্জায় আঘাত করে নতুন প্লাটিলেট উৎপাদন কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্লাটিলেটও ধ্বংস করে ফেলে। এছাড়া রক্তনালীর পরিবর্তনের কারণে প্লাটিলেটের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে এবং জীবনঝুঁকি তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে অ্যাফারেসিস প্লাটিলেট সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ সমাধান হিসেবে বিবেচিত। এই পদ্ধতিতে একজন ডোনারের শরীর থেকে সরাসরি প্লাটিলেট সংগ্রহ করা হয় এবং বাকি রক্ত উপাদান আবার তার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এতে একজন ডোনার থেকেই প্রয়োজনীয় পরিমাণ উচ্চমানের প্লাটিলেট পাওয়া যায়, সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে এবং তা রোগীর শরীরে দ্রুত কার্যকর হয়।
তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো-সমৃদ্ধশালী শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে এখনো একটিও অ্যাফারেসিস প্লাটিলেট মেশিন নেই। অথচ ডেঙ্গুর চাপের দিক থেকে জেলাটি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। ২০২৫ সালে সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজারের বেশি মানুষ এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১২ জন। সেই সময় নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালগুলোতেও ব্যাপক চাপ তৈরি হয়।
২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া) এ আগস্ট মাসে ১১৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৯ জনে, যা প্রায় দ্বিগুণ। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল (খানপুর) এ আগস্টে ১৬৬ জন থেকে সেপ্টেম্বরে ২৭৫ জনে রোগী বেড়েছে। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ চাপে শয্যাসংকট দেখা দেয়, অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হয়।
চলতি বছর ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ২১৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বর্ষা শুরু হলে এই সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় গুরুতর ডেঙ্গু রোগীর স্বজনদের প্লাটিলেটের জন্য প্রায়ই ঢাকায় ছুটতে হয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয়ভাবে উন্নত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকিও।
নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মুশিউর রহমান জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু রয়েছে। তবে অ্যাফারেসিস প্লাটিলেট মেশিনের দাম বেশি এবং বছরের অন্যান্য সময় এর ব্যবহার সীমিত হওয়ায়, স্থাপনের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি পরিকল্পনা নেই।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসাবাড়ির আঙিনা, ছাদ ও আশপাশে যাতে পরিষ্কার পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজ, সাংবাদিক সমাজ, প্রেস ক্লাব, চেম্বার অব কমার্সসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অ্যাফারেসিস প্লাটিলেট মেশিন স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছে, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল (খানপুর) এবং নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া)-সহ জেলার বড় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত অ্যাফারেসিস প্লাটিলেট মেশিন স্থাপন করা জরুরি। এতে স্থানীয়ভাবে প্লাটিলেট সরবরাহ নিশ্চিত হবে, রোগীর জীবনরক্ষা সহজ হবে এবং স্বজনদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
ডেঙ্গু মৌসুমি হলেও এর ঝুঁকি মারাত্মক। আগাম প্রস্তুতি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই সময় থাকতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নারায়ণগঞ্জে অ্যাফারেসিস মেশিন স্থাপন এখন আর বিলাসিতা নয়- এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যক একটি উদ্যোগ।







































আপনার মতামত লিখুন :