ঈদ আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই আবার কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ। জীবিকার টানে মানুষ ফিরছে কর্মস্থলে, খুলছে দোকানপাট, সচল হচ্ছে কলকারখানা, অফিস-আদালত। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও একটি প্রশ্ন যেন পিছু ছাড়ছে না; নাগরিক দুর্ভোগ কি এবার কমবে, নাকি আবার সেই চিরচেনা ভোগান্তির চক্রে ফিরে যাবে শহর?
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব আদায়কারী জেলা হলেও এই অর্থের প্রভাব নাগরিক জীবনে কতটা দৃশ্যমান, তা নিয়ে সচেতন মানুষদের মধ্যে ক্রমেই সংশয় বাড়ছে। বছরের পর বছর যানজট, ফুটপাত দখল, হকার সমস্যা এবং নানামুখী অব্যবস্থাপনা নগরবাসীর জীবনকে জটিল করে চলেছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলার মানুষ কেন এই ভোগান্তির মুখোমুখি হবেন, এই প্রশ্নের জবাব এখন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত।
দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ শহর নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রকট হচ্ছে যানজট। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লেগেই থাকে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অবৈধ পার্কিং, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা, অপরিকল্পিত স্ট্যান্ড এবং ফুটপাত দখল করে বসা হকার-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, এমনকি ব্যবসায়ীরাও প্রতিদিন এই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে, ব্যবসায়িক ক্ষতি বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শহরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতায়।
ফুটপাত দখলের বিষয়টি নাগরিকদের অন্যতম বড় ক্ষোভের জায়গা। পথচারীদের জন্য নির্ধারিত ফুটপাত এখন হকারদের দখলে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কেই হাঁটছেন- যা একদিকে যেমন বিপজ্জনক, অন্যদিকে যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সচেতন মহলের মতে, হকার উচ্ছেদ নয়, পরিকল্পিত পুনর্বাসনের মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
রাত নামলেই শহরের আরেকটি ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। অন্ধকার সড়ক, বিকল স্ট্রিটলাইট, আর সেই সুযোগে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। সব মিলিয়ে নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক এলাকায় রাতে চলাচল করা এখন রীতিমতো ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকদের সহজ প্রশ্ন-একটি শহরে ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি এতটাই কঠিন?
পরিবেশগত সংকটও কম নয়। উন্নয়নকাজের ধীরগতি, খোঁড়াখুঁড়িতে সৃষ্ট ধুলাবালু এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শহরের পরিবেশকে করছে বিষাক্ত। দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতা, যা নগরজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।
তবে আশার কথা, এসব সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এসেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ঈদের পর হকার ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। নগরবাসী এখন চান, এই আশ্বাস কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নে রূপ নিক।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং বিকেএমইএর সহ-সভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, "এই শহরে যেমন সমস্যা অনেক, সমাধানের পথও অনেক। প্রয়োজন আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। যানজট, ফুটপাত দখল আর নাগরিক অব্যবস্থাপনা শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যকেও প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নারায়ণগঞ্জের শিল্প ও বাণিজ্যের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে একটি সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব। ব্যবসায়ী সমাজ এই লক্ষ্যে সবার সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে সর্বদা প্রস্তুত।"
নগর বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল শিল্প-কারখানার প্রসার নয়; বরং এমন একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা-যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, দূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাস করতে পারবে এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত থাকবে।
এই শহর শুধু ইট-পাথরের নয়; এটি লাখো মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার নাম। সময়ের দাবি এখন একটাই আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন।































আপনার মতামত লিখুন :