নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে স্নানোৎসব। ‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ এ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে জগতের যাবতীয় সংকীর্নতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় হিন্দু পুন্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান শুরু করে। পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস তিথির নির্দিষ্ট সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্যস্নান করলে সব পাপ মোচন হয়ে যায়।
শুল্কা তিথি অনুযায়ী বুধবার বিকাল ৫ টা ১৮ মিনিট থেকে পুণ্যস্নানের লগ্ন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নদের দুই পাড়ের ২৪টি ঘাটে লাখো পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। দেশীয় পুণ্যার্থীর পাশাপাশি এবারো বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পুণ্যার্থীরা অংশ নিয়েছে মহাতীর্থ অষ্টমী স্নান উৎসবে। দুইদিন ব্যাপী এ স্নানোৎসব শেষ হয় বৃহস্পতিবার দুপুর ২ টা ৫৯ মিনিটে।
পুরোহিতরা জানান, ত্রেতা যুগে ব্রাহ্মণ জমদগ্নি ও রেণুকার পুত্র পরশুরাম মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে তপস্যা করেন। পরে নির্দেশনা অনুযায়ী চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে এক পবিত্র নদীতে স্নান করে পাপমুক্ত হন। পরবর্তীতে সেই পুণ্যধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করতে তিনি লাঙ্গল দিয়ে হিমালয় থেকে সমভূমিতে জলধারা নিয়ে আসেন। বর্তমান নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করলে স্থানটির নাম হয় লাঙ্গলবন্দ।
হিন্দু পুন্যার্থীদের মতে পবিত্র নদ ব্রহ্মপুত্রে স্নানমন্ত্র পাঠপূর্বক নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, হরতকী, ডাব, আম্রপল্লব ইত্যাদি দিয়ে পিতৃকূলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে ভক্তরা। স্নান শুরু পরে আশেপাশের মন্দিরগুলোতে সাধু সন্যাসীরা সমবেত হয়ে ভক্তিমূলক গান, বাজনা শুরু করেছে।
লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সর্ম্পকে চমৎকার কাহিনী
লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সর্ম্পকে চমৎকার এক কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরান মতে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যার নাম ভোজকোট। এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম রুষন্নন্ত, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সুষেণ, তৃতীয় পুত্রের নাম বসু, চতুর্থ পুত্রের নাম বিশ্বাসুর, পরশুরাম ছিলেন সবার ছোট। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসঙ্কট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরী গণসহ)। পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে পিতা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামত পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়। পরশুরাম মনে মনে ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এই জন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।





































আপনার মতামত লিখুন :