গত কয়েকদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখলকারী হকারদের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নমনীয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর এই সুযোগ হকারদের জন্য যেন সোভাগ্য হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরেই হকাররা দিব্যি ফুটপাতে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসছেন আর ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছেন। তাদের কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে না।
সবশেষ শুক্রবার ছুটির দিনে নারায়ণগঞ্জ শহরেরর প্রধান সড়কজুড়েই ফুটপাতে হকাররা কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। আর এ নিয়ে পথচারীদের আবারও দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে তাদের বেগ পোহাতে হচ্ছে।
এর আগে গত ১৩ এপ্রিল শহরের সকল সড়কের ফুটপাতের হকারদের উচ্ছেদ করে সিটি করপোরেশন। যদিও আগে থেকে ঘোষণা থাকায় সেদিন কোন হকার বসেনি। এর পর কয়েকদিন পর্যন্ত মোটামুটি শহরের ফুটপাত ছিল ফাঁকা। তবে হকাররা ফুটপাতে ফেরার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় দেন দরবার করতে থাকেন। তবে এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা ছিলো খুবই কঠোর।
সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা প্রতিনিয়ত হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছিলেন। ফুটপাতে হকার পেলেই তাদের মালামাল জব্দ করা হতো। সেই সাথে হকাররাও ফুটপাতে বসতে পারতো না। কিন্তু এবার সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা যেন নিরব হয়ে পড়েছেন। তাদের উচ্ছেদ অভিযানে আর দেখা মিলছে না। আর এই সুযোগে হকাররা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন।
এদিকে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালিন সময়ে হকাররা তাদের আক্রমণাত্বক রূপ দেখিয়েছেন। গত ৪ মে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে কয়েকজন উচ্ছেদ কর্মীকে বেধড়ক মারধর করেছে।
জানা যায় এদিন বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা বঙ্গবন্ধু সড়কে উচ্ছেদ অভিযান বের হন। আর এই উচ্ছেদ অভিযানের এক পর্যায়ে হকাররা উচ্ছেদ কর্মীদের উপড় চড়াও হন। সেই সাথে কয়েকজন কর্মীকে বেধড়ক মারধর করে গুরুত্বর আহত করেন। পাশাপাশি জব্দকৃত মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে যান।
আহতদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সোমবার বিকেলে প্রতিদিনের মতো শহরের সড়ক গুলোতে হকার উচ্ছেদে কাজ শুরু করে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কাজে নিয়োজিত কর্মীরা। এসময় শহরের প্রেসক্লাবের সামনে হকাররা একটি মিছিল নিয়ে তাদের ওপরে হামলা চালায়। তাদের মারধরে জাহাঙ্গীর ও রুহুল নামে দুই কর্মচারী সহ অন্তত পাঁচ ছয়জন আহত হয়। ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
গত ২০ এপ্রিল ফুটপাতে না বসার জন্য আহ্বানকারী ভলান্টিায়ারদের উপর হামলা করেছেন হকাররা। উই আর ভলান্টিয়ার্সের সদস্য ফারদিন শেখ বলেন, আমরা হকার উচ্ছেদে কাজ করে থাকি। বিকেলে কাজ করতে গিয়েছিলাম। এসময় মর্ডানের সামনে থাকা হকাররা টার্গেট করে হামলা করে। তারা হকার নামধারী গু-া। তারা আমার ছোট ভাইয়ের উপর হামলা করে তার হাত কেটে ফেলে।
তবে কয়েকদিন হকার না থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। ফলে গত কয়েকদিন ফুটপাতে মানুষের চলাচল বেড়েছে। দ্রুত সময়ে হাঁটার কারণে তারা সিটি করপোরেশনের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি মনে হয় বেশিদিন স্থায়ী হচ্ছে না। নগরবাসীর ভোগান্তি আবারও শুরু হয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, জেলা পুলিশ প্রশাসন ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে হকারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গিয়ে ফুটপাত ফাঁকা করে দিয়েছিলো। আর প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আইভী। ফলে কোন ভাবেই ফুটপাতে বসতে ব্যর্থ হয়ে আন্দোলন শুরু করেন হকাররা। এর ধারবাহিকতায় ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর মেয়র আইভীকে স্মরকলিপি প্রধান করেন। ওই সময় আইভীর বক্তব্যে পরই কঠোর হয়ে হকাররা। একের পর এক কর্মসূচি ও স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমানের কাছে যান। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি হকারদের সমাবেশে শামীম ওসমান হকারদের বঙ্গবন্ধু সড়কে বসার জন্য পক্ষে বক্তব্য দেন। আর পরদিনই হকারা আইভীর উপর হামলা চালায়। যেখানে যুক্ত হয় শামীম ওসমানের অনুগামী নেতাকর্মীরাও। ইট পাটকেলের সঙ্গে গুলি করা হয় মেয়র আইভীকে লক্ষ্য করে। সেসময় মেয়র আইভী সহ অর্ধশতাধিক তার অনুগামী নেতাকর্মী আহত হয়। এছাড়া পরেও প্রায়শই হকারদের পক্ষেই কথা বলেন শামীম ওসমান।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হত্যাচেষ্টার পর পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসা হকাররা। সদর মডেল থানায় একটি মামলা করে পুলিশ। ২০২১ সালের ৯ মার্চ বিকেলে ফুটপাতে বসার দাবীতে হকাররা বিক্ষোভ করে। সেদিন পুলিশের সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে।
নগরবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দাদের ভোগান্তির অপর নাম হকার। এখানকার হকাররা প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কের ফুটপাতগুলো দখলে রাখে। ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তাও দখলে নেয়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছেন শহরবাসী। কোনোভাবেই যেন এই হকারদের দমানো যাচ্ছে না। তাদের সংখ্যা ব্যাপক হয়ে গিয়েছিলো।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে হকাররা যেন লাগামছাড়া হয়ে পড়েছেন। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত পুরো সড়কই দখল করে রাখছেন। এতে করে নগরবাসী অসহনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
নতুন প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা তিনি যেন নগরবাসীকে অতিদ্রুত ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেন।


































আপনার মতামত লিখুন :