মাদক বিক্রিতে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন। আস্থা গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত কোনো ক্রেতাকেই কাছে ভিড়তে দেওয়া হয় না। কেউ মাদক কিনতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় দাঁড়াতে বলা হয়। পরে ড্রোনের সাহায্যে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। সে সময় ক্রেতা টাকা দেন নগদে বা বিকাশের মাধ্যমে। সম্প্রতি এমন চাঞ্চল্যকর সব তথ্য এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। মাদক কেনাবেচায় দিনেই আয় লাখ লাখ টাকা। এ আয়েই মাদকের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। আর সাম্রাজ্য রক্ষায় আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। সেই সঙ্গে আধিপত্য বজায় রাখতে বাড়ছে খুনোখুনি। আর মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী স্থানীয়দের ওপর হামলার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। রেহাই মিলছে না মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও। তবে এসব মাদক স্পটের বেপরোয়া গডফাদাররা অধরা। গত ২ বছরের ব্যবধানে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটলেও অধরাই রয়ে যাচ্ছে বেশীরভাগ গডফাদার ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, গত ৫ মে দুপুরে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ লিচুবাগ এলাকায় সাদা পোশাকে তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া র্যাবের একটি গোয়েন্দা দলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, আহত হন র্যাবের তিন সদস্য। পরে ওই দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের দেওভোগ এলাকায় যৌথ অভিযান চালায় র্যাব ও পুলিশ। অভিযানে ড্রোন, সিসি ক্যামেরা, ল্যাপটপসহ বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র জব্দ করা হয়। আটক করা হয় ১৩ জনকে।
গত ৬ মে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে র্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন জানান, ‘মাদক ব্যবসায়ীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে আস্তানার আশপাশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করত। পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হতো, যাতে অভিযানের আগাম তথ্য পেয়ে তারা দ্রুত সরে যেতে পারে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জে মাদকের ২০টি স্পটের কথা আলোচনায় আসে। ওই সময় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে এক নির্বাচনী জনসভায় গত ১৫-১৬ বছর নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক খারাপ ছিল উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ শহরে ২০টা স্পট আছে, যেখানে মাদক ব্যবসা হয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণে আমরা ব্যবস্থা নেব। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরব।’
নির্বাচনের পর বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আলোচিত স্পটগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা শুরু করে। অভিযান চালাতে গিয়ে একের পর এক আক্রান্ত হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। চলতি বছরের ১৫ মার্চ শহরের গলাচিপা এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ৫ মে শহরের বোয়ালিয়াখাল এলাকায় র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা হয়। এর আগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর র্যাবের একটি গোয়েন্দা দল মাসদাইরে মাদক ব্যবসায়ীকে ধরতে গেলে অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে তাদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে এক গৃহবধূ গুলিবিদ্ধ হন। ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ মাসদাইরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২৩ জুলাই ফতুল্লার ঘোষেরবাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার অভিযানে গিয়ে ছুরিকাঘাতের শিকার হন ফতুল্লা মডেল থানার এসআই শামসুল হক সরকার।
এ ছাড়া চলতি বছর মাদক বেচাকেনায় আধিপত্য বিস্তার ও বিরোধে শুধু ফতুল্লাতেই কয়েকজন নিহত হয়েছেন। গত ২৯ মার্চ মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার একটি গ্যারেজে নিয়ে মারধরের পর শুভ নামের একজনকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পর দিন রূপগঞ্জের কাঞ্চন এলাকার এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের পাশ থেকে শুভর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ফতুল্লার মাসদাইরে রায়হান মোল্লা নামে এক বাবুর্চিকে কুপিয়ে হত্যা করে রাজ্জাক বাহিনী। এ ছাড়া চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি রাজ্জাক বাহিনীর সদস্যদের হাতে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে মোবারক হোসেন ও নজরুল ওরফে বগল নামে দুই যুবককে গুমের অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল মাদক স্পটের টাকা উত্তোলন নিয়ে বিরোধে রাজ্জাক বাহিনী কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে শামীম নামে একজনকে। ২০২১ সালের ২৯ জুন মাদকের স্পট নিয়ে বিরোধে রাজ্জাক বাহিনীর হাতে হত্যার শিকার হয় রুবেল। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ফতুল্লার মাসদাইরে পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলার আসামি ও কিশোর গ্যাং লিডার ইভনকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ সাইফুল গ্রুপ।
চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় বাড়ি থেকে ডেকে ইমন শেখ নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে জাহিদ বাহিনী। এর আগে ১ জানুয়ারি শহরের নাগবাড়ি এলাকায় রায়হান খান নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মাদক ব্যবসায়ী দানিয়ালকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ৬ মার্চ পিটালিপুলে সাব্বির নামের আরেক যুবক খুন হয়।
স্থানীয়রা জানান, শহরের প্রধান সড়ক ও আশপাশের অলিগলিতে লাইন ধরে মাদক বিক্রি হচ্ছে। এসব স্পটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে ফিল্মি স্টাইলে ধারালো অস্ত্র সহকারে হামলা চালিয়ে মাদক বিক্রেতাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের সহযোগীরা। অপরাধীরা বসতবাড়ি ভাড়া নিয়ে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। ছাদ ভাড়া নিয়ে ড্রোন উড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে মাদক ব্যবসা। মাদকের আধিপত্য নিয়ে অসংখ্য হত্যাকান্ড ঘটছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। ওই সময়ে মাদক ব্যবসায়ীরাও সুসংগঠিত হয়। এখন তারা অনেক বেপরোয়া।’ এদের ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের পাশাপাশি অপরাধীরা যাতে দ্রুত জামিনে বের না হতে পারে, সে জন্য মামলার সময়েও সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ আইনজীবী।
এ বিষয়ে র্যাব ১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এএইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা করে কেউ পার পায়নি। ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’




































আপনার মতামত লিখুন :