News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২

নারায়ণগঞ্জে জামায়াতে ইসলামের বিদায়


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম নারায়ণগঞ্জে জামায়াতে ইসলামের বিদায়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে শুরুতে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তার এক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী উপস্থিতি ক্রমশ ফিকে হয়ে যাওয়ায় জেলার রাজনৈতিক মাঠে সৃষ্টি হয়েছে নতুন সমীকরণ। পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একের পর এক আসন থেকে প্রার্থী প্রত্যাহারের ফলে কার্যত তিনটি আসনেই এখন আর জামায়াতের কোনো প্রার্থী নেই। বাকি দুটি আসনে দলটির প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারেননি।

সর্বশেষ রোববার নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর আগে জোটগত সমঝোতার কারণে দুটি আসনে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। ফলে পুরো জেলার নির্বাচনী চিত্রে জামায়াতের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।

গত ২৫ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া জানান, দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মো. শাহাজান শিবলীকে সমর্থন দেবেন। তিনি বলেন, বৃহত্তর জোটের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনের শুরুতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে ঘিরে কিছুটা আলোচনার সৃষ্টি হলেও রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। এই দুই আসনে বর্তমানে বিএনপির প্রার্থীরাই আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেলেও জামায়াতে ইসলামী সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। জোটগত সমীকরণের কারণে সম্ভাবনাময় আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির মাঠপর্যায়ের গতি অনেকটাই থামিয়ে দিয়েছে। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন হতাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি সমর্থকদের প্রত্যাশাও অনেকাংশে ভেঙে পড়েছে।

বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তার সুযোগ নিয়ে জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল। নারায়ণগঞ্জেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। নির্বাচনের প্রাক্কালে পাঁচটি আসনেই দলটির নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল।

নারায়ণগঞ্জ-৩, ৪ ও ৫ আসনে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়নও তৈরি হয়েছিল। তবে বৃহত্তর জোট গঠনের সিদ্ধান্ত সেই সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দেয়। শক্ত অবস্থান থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে দলটির ভেতরে ‘আত্মত্যাগ’ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ভালো অবস্থান ছিল জামায়াতে ইসলামের মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমাদের। এ আসনে ধানের শীষের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মাকসুদ। তিনিও ভালো ভোট টানবেন। যদিও চালকের আসনে আছেন ধানের শীষের আবুল কালাম। কিন্তু এখানে জামায়াতের প্রার্থী থাকলে কঠিন লড়াই হতো।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন ছিল জামায়াতের জন্য বেশ উর্বর। কারণ এখানে বিএনপির প্রতীক নেই। জোটের প্রার্থী খেজুর গাছের। এখানে আবার বিএনপির দুই বহিস্কৃত নেতা গিয়াসউদ্দিন ও শাহআলম আলাদা স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন। নির্বাচনে আছেন সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী। ফলে এখানে জামায়াতের প্রার্থী থাকলে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতেন।

দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল অনেকটাই স্থবির। গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা দলটিকে আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ এনে দিলেও সেই সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সব মিলিয়ে, জোটের স্বার্থে তিনটি আসন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জামায়াতের জন্য বড় রাজনৈতিক ছাড় হলেও বর্তমান নির্বাচনে এর প্রভাব স্পষ্ট। স্বল্পমেয়াদে এটি দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, আর দীর্ঘমেয়াদে দলটির রাজনৈতিক কৌশল ও অবস্থান নতুনভাবে পুনর্গঠিত হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।