বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে রূপ নিলে দেশের বিভিন্ন জেলার মতো নারায়ণগঞ্জও হয়ে ওঠে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, আন্দোলনের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই সময় তখনকার জেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকনের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। ২০২২ সালে আহ্বায়ক কমিটি এবং ২০২৩ সালে জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব গঠনের পর গিয়াস উদ্দিন ও গোলাম ফারুক খোকন জেলার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনে কাজ করেন। দীর্ঘদিন পর দলকে মাঠে সুসংগঠিত করার চেষ্টা জুলাই আন্দোলনের সময় কাজে লাগে।
জুলাই আন্দোলনের আগে থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় জেলা বিএনপির শত শত নেতাকর্মী আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০২৪ সালের মার্চে গিয়াস উদ্দিন, গোলাম ফারুক খোকনসহ চার শতাধিক নেতাকর্মী হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পান। দলীয় নেতাদের ভাষ্য, এই আইনি চাপ সত্ত্বেও সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং আন্দোলনের প্রস্তুতি থেমে থাকেনি।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আন্দোলন যখন আরও বিস্তৃত হতে থাকে, তখন নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, শিমরাইল, চিটাগাং রোড, কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে ওঠে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। গোলাম ফারুক খোকন মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সমন্বয় করেন এবং সাইনবোর্ড থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত এলাকাকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন করেন। আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি সরাসরি উপস্থিত থেকে নির্দেশনা দেন।
অন্যদিকে তখনকার জেলা বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে দলীয় নেতারা আন্দোলনের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমন্বয়কারী হিসেবে তুলে ধরেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। আন্দোলনের দিনগুলোতে নারায়ণগঞ্জে বহুবার সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলি, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যোগাযোগ বজায় রাখা। একদিকে মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এসবের মধ্যেও বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করা সহজ ছিল না। তবুও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।
জেলা বিএনপির নেতাদের মতে, আন্দোলনের সময় গিয়াস উদ্দিন ও খোকন শুধু রাজনৈতিক নির্দেশনা দেননি আহত নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করেও ভূমিকা রাখেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের গুরুত্বের অন্যতম কারণ ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এই মহাসড়কে দীর্ঘ সময় আন্দোলন চলায় দেশের অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথে প্রভাব পড়ে। তবে এই পরিস্থিতি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের কারণে নয়; ছাত্র-জনতা, বিভিন্ন বিরোধী দল এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের সম্মিলিত উপস্থিতির ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও আন্দোলনে নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সেই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় পর্যায়ের ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক সক্রিয়তাও আন্দোলনের বিস্তারে সহায়ক ছিল। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ফিরে দেখলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও গোলাম ফারুক খোকনের নাম দলীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব হিসেবে আলোচিত হয়। ওই সময় তাদের সাহসী ভূমিকার কারণে জেলা বিএনপি জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিল।


































আপনার মতামত লিখুন :