News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

গাজী টায়ার্সে আগুনের দুই বছর : নিখোঁজ ১৮২ অপেক্ষায় স্বজনেরা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৬, ১০:২০ পিএম গাজী টায়ার্সে আগুনের দুই বছর : নিখোঁজ ১৮২ অপেক্ষায় স্বজনেরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে গাজী টায়ার্স কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর নিখোঁজ হওয়া ১৮২ জনের স্বজনদের অপেক্ষার অবসান হয়নি। কেউ জানেন না তাদের প্রিয়জনের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল। জীবিত না মৃত এই অনিশ্চয়তাই এখনো তাড়া করে ফিরছে পরিবারগুলোকে।

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট রাতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় গাজী টায়ার্সের ছয়তলা ভবন। টানা কয়েক দিন আগুন জ্বলতে থাকায় ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ঘটনার পর নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে কারখানার সামনে ভিড় করেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনের বিভিন্ন তালিকা সমন্বয় করে ১৮২ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসনের তদন্তেও এই সংখ্যা উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু দুই বছরেও সেই তালিকার কাউকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তথ্য দিতে পারেনি প্রশাসন। উদ্ধার হওয়া হাড়গোড়ের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার কথা বলা হলেও সেই প্রক্রিয়াও দৃশ্যমানভাবে এগোয়নি।

ঘটনার পর গঠিত জেলা প্রশাসনের আট সদস্যের তদন্ত কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা নয়, অগ্নিসংযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি নিখোঁজদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করা এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় উদ্ধার হওয়া হাড়গোড় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়।

তবে তদন্তের পরও মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি। কারখানার ভেতরে ঠিক কতজন ছিলেন, নিখোঁজের তালিকার ১৮২ জনের সবাই সত্যিই ওই রাতে সেখানে ছিলেন কি না, আগুনে কতজন মারা গেছেন এবং ভবনের ভেতরে থাকা হাড়গোড় কার এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে আগুনের পর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে নিখোঁজদের কয়েকজন স্বজন ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে কিছু হাড়গোড় উদ্ধার করে পুলিশের কাছে জমা দেন। সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর কথা জানানো হলেও দীর্ঘ সময়েও পরিবারগুলোকে কোনো চূড়ান্ত ফল জানানো হয়নি।

এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু একটি নিখোঁজের ঘটনা নয়; এটি ১৮২টি পরিবারের অনিশ্চয়তার গল্প। কারও ঘরে স্বামী নেই, কারও সন্তান, কারও ভাই কিংবা বাবা। স্বজনদের অনেকে প্রথম দিকে হাসপাতাল, থানা ও বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেছেন। কেউ আশায় ছিলেন হয়তো কোনোভাবে ফিরে আসবেন প্রিয়জন। সময় যত গড়িয়েছে, সেই আশা ক্ষীণ হয়েছে; কিন্তু নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় শোকটুকুও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না।

ঘটনার এক বছর পরও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, নিখোঁজদের পরিবারগুলোর কাছে তাদের স্বজনদের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই এবং উদ্ধার তৎপরতায়ও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

স্বজনদের দাবি, কেউ জীবিত থাকলে তাকে খুঁজে বের করা হোক, আর মারা গেলে অন্তত দেহাবশেষ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক। কারণ প্রিয়জনের পরিণতি না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করা তাদের জন্য আরও বড় যন্ত্রণা। অন্যদিকে গাজী টায়ার্সের পোড়া ভবনটিও এখন সেই অমীমাংসিত ঘটনার নীরব সাক্ষী। আগুনের কালো দাগ, ধসে পড়া অংশ আর পরিত্যক্ত স্থাপনা যেন দুই বছর আগের সেই রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। অথচ সময়ের সঙ্গে ঘটনাটি যেন প্রশাসনিক ব্যস্ততার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিখোঁজদের তালিকা পুনরায় যাচাই, পরিবারের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, উদ্ধার হওয়া হাড়গোড়ের দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান এই চারটি কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। তাহলেই অন্তত ১৮২টি পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তর পেতে পারে। দুই বছর আগে গাজী টায়ার্সে আগুন শুধু একটি কারখানা পুড়িয়েছিল। সেই আগুনের ধোঁয়া আজও কাটেনি ১৮২টি পরিবারের জীবন থেকে।  

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, পুলিশের তদন্তে নিখোঁজ ১৮২ জনের কারও সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজদের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরের সর্বশেষ লোকেশন ও নম্বরগুলো সচল আছে কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

পোড়া ভবন থেকে উদ্ধার হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বজনদের কেউ হাড়গুলো তাদের নিখোঁজ স্বজনের বলে দাবি না করায় ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি। নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ডিএনএ নমুনাও চাওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।