News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

এমপি নির্ভর নারায়গঞ্জের রাজনীতি


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম এমপি নির্ভর নারায়গঞ্জের রাজনীতি

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদের ঘিরে রাজনৈতিক বলয় তৈরি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই প্রবণতা যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জেলার পাঁচটি আসনে নতুন সংসদ সদস্যরা সামনে আসার পর স্থানীয় রাজনীতির বড় একটি অংশও এখন তাদের ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে স্থানীয় সংগঠনের নেতৃত্ব, ভবিষ্যৎ প্রার্থী বাছাই, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা- কিংবা মাঠের রাজনৈতিক তৎপরতা সবখানেই সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি কি ধীরে ধীরে দল ও সংগঠনকেন্দ্রিকতা হারিয়ে এমপি-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলেও জেলার রাজনৈতিক চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। পাঁচটি আসনের চারটিতে বিএনপি এবং একটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জয় পেয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির আবদুল্লাহ আল আমিনের জয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্প ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এই প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দলের সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তির প্রভাব বড় হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দল ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি নিয়ে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। মহানগর বিএনপির কমিটি নিয়েও নানা আলোচনা চলছে এবং স্থানীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের সমীকরণ বদলের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় নেতাদের অনেকেই দলীয় সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি এমপির সঙ্গে সম্পর্ককে রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।

এমপি-কেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে তৃণমূলে। একজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে যখন একাধিক বলয় তৈরি হয়, তখন দলের ভেতরেই প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। কারা এমপির ঘনিষ্ঠ, কারা দূরে এই হিসাব কখনো কখনো দলের পুরোনো নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করতে পারে। আবার এমপির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকা কোনো নেতা যদি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হন, অথচ তৃণমূলে দীর্ঘদিন কাজ করা অন্য কেউ যদি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হন, তখন দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। এই বাস্তবতায় তৃণমূলের রাজনীতিতে এখন একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে যোগ্যতা ও সাংগঠনিক অবদান, নাকি এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বহু বছর ধরে কাজ করা বেশ কয়েকজন নেতা নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক বলয় তৈরি করেছেন। তাদের কেউ সাবেক এমপি, কেউ জেলা বা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের রাজনীতিতে সক্রিয়। নতুন এমপিদের আবির্ভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কোনো আসনে এমপি হওয়ার জন্য একাধিক প্রভাবশালী নেতা দীর্ঘদিন মাঠে থাকলে নির্বাচনের পর তাদের মধ্যে কে এমপির সঙ্গে সমন্বয় করবেন, কে নিজের রাজনৈতিক বলয় ধরে রাখবেন  সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের নির্বাচনী রাজনীতিতে অতীতে একাধিক হেভিওয়েট নেতার উপস্থিতি এবং দলীয় মনোনয়নকে ঘিরে প্রতিযোগিতা ছিল। ফলে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরও সেই পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

তবে এমপি-কেন্দ্রিক রাজনীতিকে সবসময় নেতিবাচক হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। একজন জনপ্রতিনিধি যদি দলীয় সংগঠন, তৃণমূলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন, তাহলে তার নেতৃত্ব স্থানীয় রাজনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে।  সমস্যা তখনই, যখন দলীয় সংগঠন দুর্বল হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা শক্তিশালী হয়। কারণ একজন এমপি পাঁচ বছর পর নির্বাচনের মুখোমুখি হন। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সংগঠন টিকে থাকে দীর্ঘ সময়। তাই ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনকে শক্তিশালী না করলে দীর্ঘমেয়াদে দলই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এমপিদের ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও এখন আগের চেয়ে বেশি। যানজট, জলাবদ্ধতা, মাদক, চাঁদাবাজি, শিল্পাঞ্চলের সমস্যা, সড়ক, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবার মতো বিষয়গুলোতে মানুষ দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চায়। ফলে এমপির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তার কাজের মূল্যায়নও হবে মাঠে। শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি বা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ নয় সাধারণ মানুষের কাছে এমপির গ্রহণযোগ্যতা কতটা তৈরি হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, দলীয় সংগঠনের পুনর্বিন্যাস এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সব মিলিয়ে জেলার রাজনীতির সমীকরণ বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে এমপিরা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। কিন্তু রাজনীতির কেন্দ্র যদি কেবল সংসদ সদস্যের কার্যালয় বা ব্যক্তিগত বলয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়, তাহলে তৃণমূলের সাংগঠনিক রাজনীতি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অন্যদিকে এমপির নেতৃত্ব যদি দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করা, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর দিকে যায়, তাহলে এই প্রভাবই ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তি হতে পারে।