নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ছিল নির্বাচনী লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা নির্বাচনের মাঠে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন। ভোটের লড়াই শেষ হলেও তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চলছে নানা আলোচনা।
নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের চারটিতেই বিএনপির দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ছয়জন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মাঠে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রূপগঞ্জের মোহাম্মদ দুলাল হোসেন, আড়াইহাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করিম এবং ফতুল্লায় মোহাম্মদ শাহ আলম ও গিয়াস উদ্দিন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের বহিষ্কারও করা হয়। তবে নির্বাচনের ফল বলছে, বিদ্রোহীদের কেউই সংসদে যেতে পারেননি।
ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরাজিত হলেও কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী যে নিজেদের আলাদা ভোটভিত্তি ধরে রেখেছেন, সেটি স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে শাহ আলমের প্রায় ৪০ হাজার ভোট এবং গিয়াস উদ্দিনের ২০ হাজারের বেশি ভোট দলীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি এমন বার্তাই দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো বহিষ্কৃত নেতারা কি আবার মূল দলে ফিরবেন, নাকি নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক বলয় ধরে রাখবেন। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের পর দলীয় বিরোধ মিটিয়ে অনেক নেতারই মূল দলে ফেরার নজির রয়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জের বিদ্রোহী নেতাদের ক্ষেত্রেও দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, এমনটা এখনই বলা কঠিন।
তবে বিএনপির জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নেতাদের ধরে রাখা দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। কারণ নির্বাচনের আগে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়া নেতাদের বহিষ্কার করলেও ভোটের মাঠে তাঁদের ব্যক্তিগত প্রভাব একেবারে অস্বীকার করা যায়নি।
বিশেষ করে ফতুল্লার শাহ আলমের ভোট এবং সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জের গিয়াস উদ্দিনের ভোটের হিসাব দলীয় নেতৃত্বের জন্য আলাদা রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তাঁরা জয় পাননি, কিন্তু নিজেদের অনুসারী ও ভোটারদের একটি অংশ ধরে রাখতে পেরেছেন। ফলে ভবিষ্যতে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান কতটা থাকবে, সেটি নির্ভর করবে দলীয় সিদ্ধান্ত, কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মাঠে তাঁদের সাংগঠনিক তৎপরতার ওপর। অন্যদিকে যারা তুলনামূলকভাবে কম ভোট পেয়েছেন, তাঁদের সামনে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দুলাল হোসেনের মতো প্রার্থীর ভোটের পরিমাণ দেখাচ্ছে, ব্যক্তিগত পরিচিতি থাকলেই দলীয় প্রতীকের বাইরে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা যায় না।
এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাই নতুন প্রশ্ন বিদ্রোহীরা কি আবার দলে ফিরবেন, নাকি নতুন রাজনৈতিক বলয় তৈরি করবেন। তাঁদের কেউ যদি মূল দলে ফিরতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যৎ স্থানীয় নেতৃত্বের সমীকরণে নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে। আর যদি দূরত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিএনপির ভেতর থেকেই নতুন নেতৃত্বের উত্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের মাঠে বিদ্রোহীরা হারলেও রাজনীতির মাঠ থেকে তাঁরা সবাই হারিয়ে গেছেন এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি। বরং তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁরা সাময়িক বিদ্রোহী, নাকি ভবিষ্যতের আলাদা শক্তি।





































আপনার মতামত লিখুন :