নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে কয়েকদিন ধরে চলছে শ্রমিক অসন্তোষ। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে টানা তিন দিন ধরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফতুল্লার শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল, জালকুড়ি ও আশপাশের এলাকা। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় মজুরি বাড়ানোর দাবি, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন মালিকপক্ষ। সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলে মালিক-শ্রমিকের মধ্যকার আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
গত ২ নভেম্বর সোমবার ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ফতুল্লার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা রাস্তায় নামেন। শিবু মার্কেট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন চালকেরা। কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
পরদিন মঙ্গলবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিবু মার্কেট, স্টেডিয়াম ও জালকুড়ি এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সংঘর্ষ হয়। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিককে আটকও করা হয়।
বুধবারও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সকালে কাঠেরপুল এলাকায় শ্রমিকেরা আবারও সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ফলে টানা তিন দিনের আন্দোলনে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবির পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত, শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার, অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতি বন্ধ এবং শ্রম আইন বাস্তবায়ন।
অন্যদিকে, শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কারখানার নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে। কোনো কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলন অন্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়লে উৎপাদন কার্যক্রম বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় শিল্পের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, প্রশাসন ও শিল্প পুলিশের কার্যকর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের অভিযোগ ও দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। একই সঙ্গে কারখানার নিরাপত্তা ও উৎপাদন সচল রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাই শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শুধু মালিক কিংবা শ্রমিকের ক্ষতি করবে না, এর প্রভাব পড়বে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।



































আপনার মতামত লিখুন :