News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

শ্রমিকের আড়ালে অশুভ শক্তির খেলা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম শ্রমিকের আড়ালে অশুভ শক্তির খেলা

হাতে লাঠিসোটা, পিঠে ঝুলানো ব্যাগে ইট পাটকেল। শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে পুলিশ আর বিজিবির উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা। সড়কে যানবাহন ভাঙচুর সহ বিভিন্ন সহিংশ কাজে এমন অনেককে দেখা গেছে যারা শ্রমিক নন নিশ্চিত হয়েছেন প্রশাসন ও কারখানা মালিকেরা। বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতেও দেখা গেছে শ্রমিকদের মাঝে মিশে গিয়ে একদল যুবক সহিংশতায় জড়িয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে নাশকতা ঘটাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দেখা গেছে এমন দৃশ্য।

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে তৃতীয় দিনের মত বুধবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুটে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারসেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ সহ লাঠিচার্জ করেছে।

তবে শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে তৃতীয় কোনো পক্ষের উস্কানি রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সেই সাথে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক নেতারাও বলছে গত দুই দিন নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের যে আন্দোলন হয়েছে সেই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক নেতাদের কোনো ভূমিকা নেই। এমনকি এই আন্দোলনটি এখন আর তাদের হাতে নেই। উল্টো শ্রমিকেরা তাদেরকে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তারা মনে করছেন শ্রমিকদের মাঝে কিছু দুষ্কৃতিকারী প্রবেশ করে এসব ঘটনার উস্কানি দিচ্ছেন।

শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে প্রথম দিনের পর থেকেই পানামা গ্রুপের মেট্রো নিটিং এন্ড ডাইং এর মালিক অমল পোদ্দারের কথা ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে। প্রথম দিনের আন্দোলনে মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার শ্রমিকেরাই সর্বপ্রথম আন্দোলনে রাস্তা নেমেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতা। মেট্রো নিটিং এন্ড ডাইং মালিক অমল পোদ্দারের গত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার সাথে সুসম্পর্কের কথা চাউর রয়েছে।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম জানান, কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতিকারীরা এসব কর্মকান্ড করছে। আমরা শ্রমিকদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এখন প্রক্রিয়ার জন্য সময় দিতে হবে। আমার মনে হয় কিছু সংখ্যক অতি উৎসাহী শ্রমিক না বুঝে অথবা তাদেরকে সামনে রেখে কেউ কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি চেষ্টা করছে বলে আমার মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন বলেন, শ্রমিকদের বুঝানোর চেষ্টা করি কিন্তু শ্রমিকেরা উল্টো আমাদের নেতাদের ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেয়। ফলে আমরা আর সেখানে থাকতে পারিনি। মঙ্গলবার আমরা সকাল থেকে খোঁজ খবর রাখছিলাম। আমরা জেনেছি সকল শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন। দুপুর পর্যন্ত কাজ করেছে। আমরা ভেবেছিলাম সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে শ্রমিকেরা তারা যে এমন করবে বিন্দুমাত্র তথ্য আমাদের কাছে ছিলো না।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন জানান, এই আন্দোলন এখন আর আমাদের শ্রমিক নেতাদের হাতে নেই। আজকে নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের যে আন্দোলন হয়েছে এখানে আমরা কোনো শ্রমিক নেতাই ছিলাম না।

শিল্প পুলিশ-৪ এর সুপার আল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব কারখানা থেকে আন্দোলন করার আশঙ্কা ছিল সকালের দিকে আমরা সেসব কারখানাতে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন তারা সড়কে নামবেন না। কিন্তু দুপুরের পর এইসব ফ্যাক্টরি থেকে কিছুসংখ্যক উস্কানিদাতা অন্যান্য ফ্যাক্টরিদের শ্রমিকদের রাস্তায় নামায়। এরপর শিল্পপুলিশ, জেলা পুলিশ এবং বিজিবি ঘটনাস্থলে এসে চেষ্টা করি যারা ইন্ধনদাতা এবং শ্রমিক রয়েছেন তাদের পৃথক করা। কারণ আমরা সাধারণ শ্রমিকদের আহত করতে চাই না। আমরা তখন আন্দোলনকারীদের বুঝালে সাধারণ শ্রমিক সেখান থেকে সরে যান। কিন্তু তখনও প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে লিঙ্ক রোড অবরোধ করে এবং সামনে আগানোর চেষ্টা করে। তখন আমরা বুঝতে পারি এরা সাধারণ শ্রমিকদের ছদ্মবেশে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এসময় আমাদের উদ্দেশ্যে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে তখন আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করি। এ ঘটনায় আমাদের ১০-১২ জন আহত হয়েছেন এবং ৪-৫জনকে আটক করা হয়েছে। যারা এই আন্দোলনের উস্কানি দিচ্ছেন আমরা প্রত্যেকের ভিডিও ও ছবি সংগ্রহ করে রেখেছি। আজও যারা উস্কানি দিয়েছেন তাদেরও বিস্তারিত তথ্য আমাদের কাছে আছে। আমরা আইনগতভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। সাধারণ শ্রমিকদের দাবি দাওয়ার বিষয়ে আমরা একমত পোষণ করি। কিন্তু সাধারণ শ্রমিকদের ছদ্মবেশে যদি কোনো কুচক্রি মহল এই খাতকে অশান্ত করার চেষ্টা করে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।  

এদিকে নীট গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ত্রিশ হাজার টাকা বেতন দাবি করছেন ভাল কথা। তবে সেটা রাস্তায় কেন। মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি রয়েছে। মজুরি বোর্ডে তারা কথা বলবে। রাজপথে নেমে ত্রিশ হাজার বললে তো আর ত্রিশ হাজার হয়ে যাবেনা। পরিকল্পিতভাবে গার্মেন্ট সেক্টরটাকে অশান্ত করতে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এমনটা করা হচ্ছে। মজুরি বোর্ডে মালিক পক্ষ এবং শ্রমিক পক্ষ বসে আলোচনা করবে মজুরি নির্ধারিত হবে। মজুরি পুনর্নিধারণের ব্যাপারে আমরাও মত দিয়েছি। তাহলে এসব কেন?

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, গত দুই দিন শ্রমিক আন্দোলনে পিছনে ইন্ধনদাতা রয়েছে। তারা কারা এগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তাদের দ্রুত খুঁজে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে এসপি সাহেব ডিসি সাহেব সহ আমরা শ্রমিকদের সাথে কথা বলেছি। এখানে কেউ কেউ সাবোটাজ করার চেষ্টা করছে।’

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেছেন, শ্রমিকদের নামে যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে তারা শ্রমিকদের কেউ না। তারা এই সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য ও দেশকে হুমকির মুখে নিয়ে যেতে পায়তারা করছে। এখানে সাধারণ শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই। সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এটা দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে। আমরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে এখানে সজাগ দৃষ্টি রেখে চলছে। যেন এই গার্মেন্টসকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।