News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জে মেঝেতেই ডেঙ্গুর চিকিৎসা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম নারায়ণগঞ্জে মেঝেতেই ডেঙ্গুর চিকিৎসা

নারায়ণগঞ্জে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। নগর থেকে উপজেলা-জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। জায়গা না পেয়ে মেঝেতে রেখেই কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নারায়ণগঞ্জে নতুন করে ৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৫ জন। সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত ১৫১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগস্টে ভর্তি হয়েছিলেন ১১৯ জন। এর আগের মাস জুলাইয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৩০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছর এ হাসপাতালেই এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৩৪ জন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ ও ২০২৫ সালে এখানে ডেঙ্গু রোগীর চাপ ছিল বেশি। ২০২২ সালে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৭ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১ জনে। ২০২৪ সালে ৮৬৬ জন এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ২২৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সরকারি হিসাবে চলতি বছর নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। তবে জেলার কয়েকজন বাসিন্দা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। চিকিৎসা নারায়ণগঞ্জের বাইরে হওয়ায় এসব মৃত্যুর তথ্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর হিসাবে যুক্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সবশেষ ডেঙ্গুতে মারা যান রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের চেইনম্যান আবু ছিদ্দিক। ৫৮ বছর বয়সী এই কর্মচারী গত ২৮ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বসবাস করতেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাকান্দা চৌধুরীপাড়া এলাকায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন দুই গৃহবধূ। তাঁদের একজন আশা বেগম। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

এর মাত্র ১০ দিন আগে একই এলাকার আরেক গৃহবধূ কামরুন নেছার মৃত্যু হয়। তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সাইনবোর্ড এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯ আগস্ট রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীদের বড় একটি অংশ হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নেন। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ পর্যাপ্ত রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও বাড়িতে চিকিৎসা নেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও ব্যক্তিগত সতর্কতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে। সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে শতাধিক হটস্পট চিহ্নিত করে ডোবা-নালা পরিষ্কার, মশক নিধন ওষুধ ছিটানোসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।

তবে এসব কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে নগরবাসীর। তাঁদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। কোথাও কোথাও ডোবা-নালা ও ড্রেন অপরিষ্কার পড়ে আছে। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিও সময়মতো অপসারণ করা হচ্ছে না। ফলে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নগরের বাইরে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ময়লার ভাগাড়, অপরিষ্কার ড্রেন, ডোবা-নালা এবং দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটছে। ফলে শুধু শহর নয়, উপজেলা পর্যায়েও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারায়ণগঞ্জের জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেড়েছে। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতি রয়েছে। জনগণ সচেতন হলে সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

তিনি বলেন, বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করা জরুরি। এসব জায়গায় এডিস মশার ঘনত্ব বাড়লে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে এখনো নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য থাকলেও হাসপাতালে বাড়তে থাকা রোগীর চাপ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় শয্যা সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।