বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি শামীম ওসমানের ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে জেলা পরিষদের জায়গা লিজ দিয়েছে প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। আর এই জায়গার লিজ পেয়ে ফেরদাউসুর রহমান ভোগদখলে থাকা দোকান ও নার্সারি মালিকদেরকে জোর করে তুলে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদেরকে নানা ধরনের হুমকি ধমকি দিয়ে জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের পাশে জামতলা এলাকায় কয়েকজন দোকানদার ও নার্সারি মালিকের সাথে এই জোর জবরদস্তি চালিয়ে যাচ্ছেন ফেরদাউসুর রহমান। জেলা পরিষদ থেকে লিজ নিয়ে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে জায়গা দখলে নেওয়ার জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। লোকজন নিয়ে প্রতিনিয়ত হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

তবে জায়গার লিজ প্রসঙ্গে জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলছেন, মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের পক্ষে কয়েকজনে মিলে এই জায়গার লিজ নিয়েছে। তারা লিজ নিয়েছে। বর্তমানে যারা এখানে আছে তারা ১০-১২ ধরে কোনো রাজস্ব দিচ্ছে না। তারা রাজস্ব দেয়া ছাড়া এমনিতেই ভোগ দখল করতেছে। তারা লিজ নিয়েছিলো কিন্তু পরবর্তীতে আর রাজস্ব দিচ্ছে না। একই সাথে তারা লিজ নবায়ন করেনি।
বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ হেফাজত ইসলামে ‘ওসমানদের দালাল’ খ্যাত তথা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে পরিচিত ছিলেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীরা। তারা আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীদের নির্দেশনায় কাজ করতেন। শামীম ওসমানের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রামের আয়োজন করতেন। ধর্মীয় লেবাসে শামীম ওসমানের পক্ষ নিয়ে ধর্মকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার চেষ্টা করতেন।
হেফাজত নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন মহানগর হেফাজত ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারিরা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সেই সাথে তাদের অনুসারীদের সাথেও মাওলানা ফেরদাউসের ভালো সম্পর্ক ছিলো। বিভিন্ন সময় ওসমানদের স্বার্থ আদায়ে মাওলানা ফেরদাউস হেফাজতের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করতেন।

তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতাও পরিরক্ষিত হয়। ২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের নিজের রূপ পাল্টিয়ে নেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। তারপরও তাকে হেফাজত থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। একই সাথে জমিয়ত থেকেও বিতাড়িত হয়েছন। কিন্তু হেফাজত ইসলাম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিতাড়িত হওয়ার পরও নিরব থাকতে পারছেন না। বরং প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ব্যানারে প্রোগ্রাম করে যাচ্ছেন। সই সাথে বিএনপি নেতাদের ঘনিষ্ট হয়ে যান। বিভিন্ন সভা সমাবেশে বিএনপির সরকারের পক্ষে এবং বিরোধী দলের বিপক্ষে উদ্ভট মন্তব্য করে নিজেকে আলোচনায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এরই মধ্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে ম্যানেজ করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের পাশে জামতলা এলাকায় কয়েক শতাংশ জায়গার লিজ নিয়েছেন ফেরদাউসুর রহমান।

সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রথমে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পান সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান। কিন্তু জাকির হোসেনও নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আগ্রহী ছিলেন। এতে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সঙ্গে মধ্যস্ত করেন ফেরদাউসুর রহমান। মাঝখানে কাজে লাগান অস্ত্রধারী ক্যাডার শাহ নিজামকে। এ নিজামের পরিচালনাধীন নম পার্কে নিয়মিত আড্ডা বসাতেন তিনি। ছিলেন বুলবুল নামের একজন জমির দালাল। মতিউর রহমানকে চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো হয়। মতি তখন নিজকে অসুস্থ দাবি করে নির্বাচন থেকে সরে যান। দ্বিতীয় দফায় কৌশলে জাকির হোসেনের জন্য নৌকা প্রতীকে এনে দেন শামীম ওসমান। জাকির হোসেনের ওই নির্বাচনে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নৌকা প্রতীকে মনোনযন জমা দেন জাকির হোসেন। নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের নিয়ে জাকির হোসেনের নৌকার পক্ষে শোডাউন করেন এবং নির্বাচনী কাজ করেন।

গত ১৮ এপ্রিল জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটির আমেলা সভা হয় যেটা দলের একটি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম। সেখানে উঠে আসে এসে খবর। ওই সভাতে নারায়ণগঞ্জের জমিয়ত ও এর সহযোগি সংগঠনের ৭০ জন একটি অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অনাস্থায় ফেরদাউসুরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ ও পত্রিকার কাটিং সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। এছাড়া তার বেশ কিছু ছবিও সংযুক্ত করে।
তৎ সময়ে জমিয়তের জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হারুন অর রশিদ কথা বলেন। তিনি বলেন, ফেরদাউসুর রহমানের সাথে তার ২০ বছরের অধিক সময় ধরে সম্পর্ক। বিগত দিনে সংগঠনের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু এখন বিবেক ও মনুষ্যতের জন্য অনেক কিছু জানানো প্রয়োজন।
হারুন বলেন, ‘র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আলেপউদ্দিন (ধর্ষণ সহ নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী) এর সাথে ফেরদাউসুরের ভালো সম্পর্ক ছিল। তখন আলেপের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন ফেরদাউস। আমি কাছে থেকে দেখেছি ২০২১ সালে এ আলেপকে তথ্য দিয়ে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে গ্রেপ্তার করানো হয়। ওই সময়ে আলেপের কাছ থেকে সুবিধা নেয় ফেরদাউসুর। আমি তখন ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। বার বার ফেরদাউসকে এসব বিষয়ে সতর্ক করলেও তিনি মানেনি।
‘শুধু মনির হোসাইন কাসেমী না বরং নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার শতাধিক আলেম ওলামাকে গ্রেপ্তারের পেছনে ফেরদাউসুরের হাত ধরেছে।’ বক্তব্যে যোগ করেন হারুন।

সভায় জানানো হয়, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মনির হোসাইন কাশেমী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু তখন শামীম ওসমানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে পোলিং এজেন্টের তালিকা বিক্রি করে দেয় ফেরদাউসুর। নিয়মিত শামীম ওসমানের জামতলার বাসায় গিয়ে তথ্য আদান প্রদান করতেন।
হারুন সভায় সবশেষ ২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারীর সংসদ নির্বাচন নিয়েও কথা তুলেন। বলেন, ‘ফেরদাউস আমাদের ও দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোনাফেকগিরি করেছেন। তিনি উপরে জোট প্রার্থী ও আমাদের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমীর পক্ষ নিলেও প্রতিদিন রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম, গিয়াসউদ্দিন ও মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করতেন। এদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা এনেছেন। এক বৈঠকে রোজেল ও রানাসসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে ফেরদাউস শপথ করিয়েছেন কোনভাবেই যেন মনির কাসেমীকে জয়ী না করানো হয়। কারণ আমি যে মনির কাসেমীকে ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করিয়েছি এটা সে জানে। তিনি জয়ী হলে আমাকে জেলে ভরবে।
হারুনের বক্তব্য চলাকালে ফেরদাউস মাথা নিচু করে বসে থাকেন।
২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো।

এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার। ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা। ওই বছরের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেন।






















-20261014113949.jpg)











আপনার মতামত লিখুন :