News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩

মাসদাইর কি নারায়ণগঞ্জের ‘সিটি অফ গড’


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ১১:০৬ পিএম মাসদাইর কি নারায়ণগঞ্জের ‘সিটি অফ গড’

সিটি অফ গড মূলত অপরাধ প্রবন এলাকায় কিভাবে গ্যাং সংস্কৃতি ও সহিংশতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ে তা দেখায়। এটি একটি সিনেমা যার শেষ অংশে দেখা যায় বড় অপরাধীরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এলেও তাদের শেষ পরিণতি ভালো হয় না। প্রতিপক্ষ বা নতুন প্রজন্মের হাতে নির্মমভাবে পতন ঘটে।

সিটি অফ গড শুধু একটি গল্প না বরং একটি সতর্কবার্তা। যেখানে দেখানো হয় নিয়ন্ত্রনহীন অপরাধ কিভাবে সমাজকে গ্রাস করে। বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারায় ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বস্তি সিটি অব গড এখনো অপরাধপ্রবণ।

তেমনি ‘সিটি অফ গড’ সিনেমা খ্যাত এলাকা নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর যেখানে দশকের পর দশক ধরে সেখানে খুন, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি চলছে। কিন্তু তাদের দমন করা যাচ্ছে না।

নব্বইয়ের দশক : সন্ত্রাসীদের উত্থান
একসময়ের ভালো ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হিসেবে সুখ্যাতি পাওয়া শাহীন ৯০ এর দশকের শেষ সময়ে স্থানীয় ক্যাডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯৬ সালে পুলিশের একটি থ্রি নট বন্দুক লুট করার পর শাহীনের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দুক শব্দটি। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শাহীন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালে ৭ খুনের ঘটনার পর নূর হোসেন দেশ ত্যাগ করলে পুরো জেলার ইয়াবা ও ফেনসিডিলের একক আধিপত্য চলে আসে বন্দুক শাহীনের কাছে।

তখন থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর হামলা করতো শাহীনের লোকজন।

২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শাহীন সহ আরো ১০-১২জন অস্ত্র নিয়ে পুলিশের উপর হামলা করে।

২০১৩ সালের ৩ মে মাসদাইরে একই স্থানে ডিবির অভিযানের সময় তাদের উপর হামলা করে শাহীনের লোকজন।

২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহীনকে আটক করতে শাহীনের লোকজন র‌্যাব সদস্যদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে মারধর করে এবং তাদের একটি মটরসাইকেল পুকুরে ফেলে দেয়।

২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ডিবির প্রায় ১২ মিনিটি ধরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এক সময়ে শাহীন ক্রসফায়ারে মারা যান। ডিবির মামলায় বলা হয়, ১০ থেকে ১২ মিনিটের গোলাগুলির পর সন্ত্রাসীদের গুলিতে শাহীন গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করলে সহযোগিরা পালিয়ে যায়। উদ্ধার করা হয় ৪ রাউন্ড গুলি সহ আমেরিকার তৈরি একটি পিস্তল।

আলোচিত হত্যাকাণ্ড
২০০২ সালের ২২ অক্টোবর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদক মুক্ত করার জন্য নারায়ণগঞ্জ চেম্বারে অনুষ্ঠিত জেলার ৩২টি ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে সেনাবাহিনীর মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় অংশ গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে বক্তব্যে সাব্বির সেদিন সন্ত্রাসী মাদক ব্যবসায়ীদের নাম, ঠিকানা ও তাদের গডফাদারদের নাম প্রকাশ করেন।

সাব্বিরের ব্যাপক তৎপরতায় ঝুট সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, চুন ফ্যাক্টরী ও নারায়ণগঞ্জবাসী নিস্তার লাভ করে।

সন্ত্রাসীদের নাম বলার চার মাসের মাথায় ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী সকালে মাসদাইরে নিজ বাড়ির অদূরে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত রোকেয়া খন্দকার স্কুল থেকে বের হওয়ার ৫ থেকে ৭ গজ দূরেই আক্রান্ত হন সাব্বির আলম খন্দকার।

কালো গেঞ্জি ও ট্রাউজার পরিহিত দুই যুবক প্রথমে সাব্বিরকে লক্ষ্য করে ২ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সাব্বির তখন দৌড় দিলে সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে খুব কাছ থেকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গুলি ছোড়ে। পিঠে, পেটে, মাথায় ও হাতে ২১টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা দ্রুত পায়ে হেঁটে মাসদাইরের দিকে চলে যায়। তখন একজন রিকশাচালকও গুলিবিদ্ধ হয়। ওই মামলায় আসামীরাও সকলে খালাস পেয়ে যান।

হামলা ও অভিযান
সাব্বির হত্যাকান্ডের দুই দশকে নানা ঘটনার পর ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর সেই একই স্থানে দেখা গেছে একদল সন্ত্রাসীকে প্রকাশ্য গুলি ছুড়তে। তাদের ধরতে পরদিন আবার যখন র‌্যাব গেল তখন তাদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়।

৬ মাসের ব্যবধানে ৫ মে পাশেই বোয়ালিয়া খাল এলাকাতে র‌্যাবের উপর হামলা করে ৩ জনকে মারাত্মক জখম করে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা।

পরে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের মাসদাইর লগোয় দেওভোগ এলাকায় র্যাব ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে আস্তানা থেকে অস্ত্র, মাদক, নজরদারি সরঞ্জাম জব্দসহ ১৩ জনকে আটক করা হয়।

অভিযানে ড্রোন, চারটি সিসিটিভি ক্যামেরা জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫টি পিস্তলের গুলি, ১০টি ছুরি-চাকু, ৭টি চায়নিজ কুড়াল, ২টি রামদা, ৩টি চাপাতি ও নগদ ১১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। এ সময় ২৩৫ কেজি গাঁজা ও ১১ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি টাকা গণনার মেশিন, ল্যাপটপ ও ওজন মাপার যন্ত্র জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ১৩ জনকে আটক করা হয়।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মাসদাইর ও আশপাশ এলাকাতে এখন ডজনখানেক অপরাধী দল সক্রিয়। গত এক দশকে কয়েক ডজন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ভয়ঙ্কর মাদকের বাহিনী
ফতুল্লার মাসদাইর, ঘোষেরবাগ, গলাচিপা এলাকাতে একচ্ছত্রভাবে মাদক ব্যবসার নিয়স্ত্রক হলেন জাহিদ। তার নেতৃত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী ও ডাকাত। তাদেরকে দিয়ে বিভিন্নস্থানে এসব অপরাধগুলো করানো হয়।

২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর মাসদাইরে প্রকাশ্যে হামলা ও গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী জাহিদকে ধরতে র‌্যাবের তৎপরতা টের পেয়ে ছোরা গুলিতে জবা নামে একজন নারী গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

এর আগেরদিন ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপর ছুরিকাঘাত ও গুলির ঘটনা ঘটায় জাহিদ ও তার সহযোগীরা।

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সামছুল হক সরকার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাসদাইর ঘোষের বাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার করতে যান। জাহিদকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা যখন ফিরে আসছিলেন তখনই পেছন থেকে জাহিদের সহযোগীরা এসআই সামছুল হক সরকারের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।

ওই বছরের ১৮ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে আটক ৪ আসামিকে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জাহিদ ও তার সহযোগী মাদক ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়রা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে এখন কলঙ্কের ললাটে তিলক এটে দিয়েছে এ মাসদাইর। এখনই সময় এ জনপদের শান্তি ফিরিয়ে আনা।