ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিক দৌড়ঝাঁপ। জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে এমপি প্রার্থীরা নেমে পড়েছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কেউ পাড়া-মহল্লায়, কেউবা বাজারে কিংবা চায়ের দোকানে হাজির হয়ে কুশল বিনিময় করছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। ভোট চাইছেন, শুনছেন অভিযোগ, আবার দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা আশ্বাস।
শহর ও গ্রাম দুই জায়গাতেই চোখে পড়ছে প্রার্থীদের ব্যস্ততা। কোথাও হাত মেলানো, কোথাও সালাম, কোথাও প্রবীণ ভোটারের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ, আবার কোথাও তরুণদের সঙ্গে কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা। প্রতিটি প্রচারণায় উঠে আসছে পরিচিত এক চিত্র উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
তবে ভোটের উত্তাপ বাড়লেও এখন পর্যন্ত জেলার কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও চোখে পড়ছে, যা ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি করেছে।
এবার নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনে মোট ৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী, যারা নিজ নিজ এলাকায় আলাদা করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসায় আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠে মূলত বিএনপি ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যেই লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
শুরুর দিকে ধারণা করা হচ্ছিল, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে জমজমাট প্রতিযোগিতা হবে। কিন্তু জোটের কৌশলগত সিদ্ধান্তে জেলার গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসনে জামায়াত প্রার্থী প্রত্যাহার করায় দলটির অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে তিনটি আসনে জামায়াত প্রার্থী থাকলেও একমাত্র নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসন ছাড়া অন্য জায়গায় তারা বড় কোনো আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারেনি।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তার মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা ও সরাসরি ভোটার সংযোগ ওই আসনে নির্বাচনী সমীকরণে নতুন কৌতূহল তৈরি করেছে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে উঠে আসছে একটি অভিন্ন প্রত্যাশা তারা চান একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। অনেকের মতে, এই নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের বিষয় নয়; এটি দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাদের মতে, আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। আমরা চাই কাজ। চাকরির সুযোগ, আইনের শাসন আর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। যিনি এগুলো নিশ্চিত করতে পারবেন, তাকেই ভোট দেব।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন সহিংস উত্তাপ নেই, আছে গতিশীলতা। প্রার্থীরা মাঠে নেমেছেন, ভোটাররাও আগের মতো নীরব নন। তারা প্রশ্ন করছেন, তুলনা করছেন, অতীত কাজের হিসাব মিলিয়ে দেখছেন। এই পারস্পরিক সংযোগ ও যাচাই-বাছাই যদি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে নারায়ণগঞ্জ থেকেই হয়তো শুরু হতে পারে রাজনীতির এক নতুন বার্তা যেখানে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জবাবদিহিতাই হবে ভোটের মূল মানদণ্ড।


































আপনার মতামত লিখুন :