News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

কঠোর হয়েও শৃঙ্খলা ফেরাতে সাখাওয়াতের হিমশিম


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ১০:০০ পিএম কঠোর হয়েও শৃঙ্খলা ফেরাতে সাখাওয়াতের হিমশিম

নারায়ণগঞ্জ শহরের দীর্ঘদিনের যানজট, ফুটপাত দখল, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চলাচল নগরজীবনকে অনেক আগেই দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কঠোর অবস্থানের বার্তা দেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। একের পর এক অভিযান, নির্দেশনা ও নতুন পরিকল্পনা সামনে আনলেও বাস্তব চিত্র বলছে শহরে কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা ফেরানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে কঠোর অবস্থান নিয়েও নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিরোধের মুখে কার্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ ছিল ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদ অভিযান।

নগরীর চাষাড়া, বঙ্গবন্ধু সড়ক, দুই নম্বর রেলগেট, কালীরবাজার, নিতাইগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে অসংখ্য অবৈধ দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রথমদিকে পথচারীরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও সেই পরিস্থিতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। প্রশাসনের অভিযান শেষ হতেই আবারও অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল করে বসেন হকাররা। ফলে একই স্থানে বারবার অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে, যা প্রশাসনের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পুনর্বাসন, নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগ এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত না হলে ফুটপাত দখলের পুরোনো চিত্রই ফিরে আসবে। আর এ কারণেই হকার ইস্যুতে প্রশাসককে প্রায় প্রতিদিনই নতুন করে লড়াই করতে হচ্ছে।

শহরের আরেকটি বড় সংকট অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা। নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচল, অতিরিক্ত যানবাহন, লাইসেন্স নিয়ে অনিয়ম এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে এ খাত দীর্ঘদিন ধরেই বিশৃঙ্খল। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসক এ খাত সংস্কারের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত অটোরিকশা রাস্তায় চলছে এবং এর পেছনে দীর্ঘদিনের একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। সেই সিন্ডিকেট ভেঙে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক অটোরিকশা চলাচল, বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন রঙের রিকশা চালু, ডিজিটাল নম্বর প্লেট, চালকদের পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনীয় স্থানে চেকপোস্ট বসানোর মতো উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় যানজট ও বিশৃঙ্খলার দৃশ্য খুব একটা বদলায়নি। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কগুলোতে আগের মতোই অটোরিকশার অবাধ চলাচল নগরবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে রয়েছে।

যানজট নিরসনে নতুন ভাবনা হিসেবে 'টাউন সার্ভিস' চালুর উদ্যোগও নিয়েছে প্রশাসন। বাপ্পি চত্বর থেকে আদালতপাড়া পর্যন্ত স্বল্প ভাড়ায় গণপরিবহন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যক্তিগত ও ছোট যানবাহনের ওপর চাপ কমে। পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালুর পর সফল হলে ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়।

এদিকে শুধু যানজট নয়, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রত্যাশা করছেন নগরবাসী। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। অনেক স্থানে ড্রেন পরিষ্কার না থাকা এবং অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে দুর্ভোগ বাড়ে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত ট্রাফিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ছাড়া নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। নিয়মিত অভিযান, মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ, বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব এবং জনসচেতনতার অভাবের কারণে বাস্তব পরিবর্তন আনতে সময় লাগছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিনের রাজনীতিক ও সংগঠক হিসেবে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা রাখেন। তবে প্রশাসনিক দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে ভিন্ন। এখানে পরিকল্পনার পাশাপাশি নিয়মিত বাস্তবায়ন, তদারকি এবং আইনের সমান প্রয়োগই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তাই কঠোর অবস্থান দেখানোই যথেষ্ট নয়, সেই কঠোরতার ধারাবাহিক ফলও নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে নগরজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসকের একাধিক উদ্যোগ ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, হকার নিয়ন্ত্রণ, অটোরিকশা শৃঙ্খলা, যানজট নিরসন কিংবা নাগরিক সেবার উন্নয়ন প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখনো অনেক পথ বাকি। তাই কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নানা বাস্তবতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষণার গ-ি পেরিয়ে এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলনই শেষ পর্যন্ত শহরের চিত্র বদলে দেবে।