রাজধানী ঢাকা শহরের সবচেয়ে ছিনতাই ও অপরাধ প্রবন এলাকা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুর। এর অন্যতম কারণ ওই এলাকার মধ্যেই অবস্থিত বহু পুরোনো বিহারী ক্যাম্প। এই ক্যাম্প বা বস্তির মধ্য থেকেই ঢাকা শহরের বড় বড় সন্ত্রাসী তৈরী হয়। বস্তি থেকেই পরিচালিত হয় মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানাবিধ অপকর্মের নিয়ন্ত্রণ।
ঠিক তেমনিভাবে নারায়ণগঞ্জ শহরের অপরাধ নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র বলা হয় শহরের জিমখানা বস্তিকে। এই বস্তি থেকেই মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ হয়। রাজনৈতিক নেতারা এই বস্তির অপরাধীদের রীতিমত ভাড়া করে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। সেই সাথে রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে বস্তির হর্তাকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রাখার খবরও শোনা যায়। ফলে যখন যেই সরকার আসে, তখন সেই দলের নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেই অক্ষুন্ন থাকে বস্তির নিয়ন্ত্রণ।
নারায়ণগঞ্জ শহরের জিমখানা বস্তি মূলত অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে পারিবারিকভাবে অপরাধীরা জন্ম নেয়। একই পরিবারের মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, ছেলের স্ত্রী, মেয়ের স্বামী সকলেই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এমন ঘটনা অহরহ। পারিবারিক অপরাধ কেন্দ্র হওয়ায় শিশুদের ব্যবহার করা হয় মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র আনা নেয়ার কাজে। দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র সংরক্ষণ ও বিক্রি করার খবর পাওয়া যায় এই বস্তি থেকে। জিমখানা বস্তিটি দরিদ্র মানুষের আবাসনের কথা চিন্তা করে তৈরী হলেও পরবর্তীতে এই বস্তি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় স্থল হিসেবেই গড়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এককালে রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসনের জন্য জিমখানা কলোনী তৈরী হয়েছিলো। পরবর্তীতে সরকারি স্টাফরা এসব ঘর ভাড়া দিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এরপর সরকারি খাস জায়গার সুযোগ পেয়ে সেখানে একাধিক ঘর নির্মান করা হয়। সেগুলোতে থাকতে শুরু করে বস্তিবাসী। অল্প টাকায় বসবাসের সুযোগের পাশাপাশি ঘনবসতি হওয়ায় অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠে। বর্তমানে রাতের আধারে জিমখানা বস্তির আশেপাশে যেতেও ভয় পান সাধারণ মানুষরা। সন্ধ্যার পর থেকেই ভোর পর্যন্ত এই বস্তিবাসীদের একটি অংশ শহরের ছিনতাই কাজে সক্রিয় হয়ে ঊঠে।
জিমখানা বস্তি যে শহরের জন্য হুমকি স্বরূপ তা আঁচ করতে পেরে এই বস্তির বড় একটি অংশ উচ্ছেদ করে রেলওয়ের জায়গা এক প্রকার দখল করেছিলেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বস্তিবাসী পুনর্বাসন চায় না। তারা চায় এখানে থেকেই তাদের অপরাধ কার্যক্রম চালাতে। এমন পরিস্থিতিতে আইভী বস্তির বড় একটি অংশ গুড়িয়ে দেয় এবং সেখানে পার্ক নির্মান করেন। এনিয়ে সেসময় শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা নানান ভাবে বাঁধা তৈরী করলেও দমেননি আইভী। রেলওয়ের দায়িত্বহীন আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জায়গা দখল করে সেখানে নগরবাসীর জন্য পার্ক নির্মান করে দেন। তবে জিমখানা বস্তির একটি অংশ এখনও বহাল আছে।
সবশেষ জিমখানা বস্তির মাত্র কয়েক গজ দূরে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন সদর থানা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক লুৎফর। প্রকাশ্য দিবালোকে তার বাইক থামিয়ে তার থেকে কেড়ে নেয়া হয় সরকারি পিস্তল। ঘটনার পর চমকে উঠে নগরবাসী। পোশাকি পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনতাইয়ের এমন ঘটনায় অবাক হয় সবাই। একদিন পূর্বেই মোহাম্মদপুরে একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। ঠিক তার পরদিন পুলিশ কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের শিকার হন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পের মতই শহরের জিমখানা বস্তি এই নারায়ণগঞ্জের জন্য বিষফোঁড়া। অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য ধ্বংস করতে প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় এই ভয়াল অপরাধ চক্রের থেকে কেউই মুক্তি পাবে না।




































আপনার মতামত লিখুন :