নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য তৎপরতা নিয়ে জেলার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার পরও এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকের মতে, নানাবিধ কারনে নারায়ণগঞ্জ শহরের মধ্যে আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের ‘সেফ জোন’ হয়ে উঠেছে দেওভোগ এলাকা।
এই দেওভোগ এলাকায় রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রী ও নাসিকের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাসভবন। ছোট থেকেই তিনি এই অঞ্চলেই বেড়ে উঠেছেন। এখানে রয়েছে জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের বাসা। পাশাপাশি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাফায়েত আলম সানি, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা জিএম আরাফাত সহ এক ডজনের বেশী প্রভাবশালী নেতাদের বাসা বাড়ি। আবার আরেক দাপুটে বিএনপি নেতা জাকির খানেরও বাসাও এই দেওভোগে।
জানা গেছে, বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার পরদিনই শহরের ২ নম্বর রেলগেইট এলাকায় অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টানিয়ে স্লোগান দেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। প্রকাশ্যে এমন দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে চিহ্নিত স্লোগানদাতাদের মধ্যে একজনকে আটক করে জাকির খানের অনুসারীরা মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্লোগান দেওয়া ব্যক্তিরা দেওভোগ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের অনুসারী।
শুধু আনোয়ার হোসেনই নন, দেওভোগে আওয়ামী লীগ নেতা জিএম আরাফাতের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাদেরও সরব উপস্থিতি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ অঞ্চলের কিছু ছাত্রলীগ নেতাকর্মী প্রকাশ্যে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেককে নিয়মিত দেওভোগ এলাকায় ঘোরাফেরা করতেও দেখা যায়। তবে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিষয়টি দেখেও যেন নীরব রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। ফলে একের পর এক কর্মসূচি পালন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েও এলাকায় সক্রিয় থাকতে পারছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
সবশেষ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাফায়েত আলম সানি ৮ মার্চ দলীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টানিয়ে ইফতার বিতরণ কর্মসূচি পালন করেন। পরে সেই কর্মসূচির ভিডিও দলীয় পেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। আওয়ামী লীগের এমন প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড দেখেও বিএনপি নেতাকর্মীদের নীরব ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চাষাঢ়া কেন্দ্রিক আওয়ামী লীগ নেতারা রাতের অন্ধকারে কিছু পোস্টার লাগানো বা শীতলক্ষ্যা তৃতীয় সেতুতে লেখালেখির মতো সীমিত তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে দেওভোগ কেন্দ্রিক নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে কর্মসূচি পালন করছেন। এলাকায় দাপটের সাথে অবস্থান করার পাশাপাশি রাজনীতিতে ফেরার জোড়ালো চেষ্টা চালাচ্ছেন। দেওভোগে বিএনপি নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করায় এখানে তোপের মুখে পড়তে হয় না আওয়ামী লীগ নেতাদের। এলাকাটিতে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা জাকির খানের উপস্থিতি থাকলেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তা নিয়ে মোটেও চিন্তিত না। বরং দেওভোগ হয়ে উঠেছে তাদের কাছে নিরাপদ স্থান।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বলছেন, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকেন। নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকাতেও যেভাবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাচ্ছেন, তাতে অনেকেই এখন এলাকাটিকে ‘শহরের গোপালগঞ্জ’বলে আখ্যা দিচ্ছেন। বিএনপি দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছে রাজনীতিতে। যেই কারনে এমপি নজরুল ইসলাম আজাদ, বিএনপি নেতা টিপু সহ অনেকেই দেওভোগ কেন্দ্রীক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তবে এই দেওভোগ এলাকার বিএনপি নেতাদের সাথে জমে ওঠা আওয়ামী লীগ নেতাদের সুসম্পর্ককে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন আগামী দিনে সেটাই এখন দেখার বিষয়।


































আপনার মতামত লিখুন :