News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

বঞ্চনার দেয়াল ভেঙে সাফ চ্যাম্পিয়ন দলে নারায়ণগঞ্জের হরিজন সানি দাস


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম বঞ্চনার দেয়াল ভেঙে সাফ চ্যাম্পিয়ন দলে নারায়ণগঞ্জের হরিজন সানি দাস

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার প্রতিই ছিল বেশি টান। অনেক সময় স্কুল ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন মাঠে। সেই একাগ্রতা আর অদম্য ভালোবাসাই আজ তাকে এনে দিয়েছে জাতীয় পরিচয়। নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া ঋষিপাড়া এলাকার সন্তান সানি দাস এখন দেশের ফুটবল অঙ্গনের এক উদীয়মান তারকা।

সাম্প্রতিক সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলের একজন সদস্য তিনি। ইনজুরির কারণে ফাইনালে মাঠে নামতে না পারলেও দলের সাফল্যে তার অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই দলের জয়ের আনন্দ যেন তার নিজের অর্জনের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে তার পরিবার ও সম্প্রদায়ের মাঝে।

বিশেষ করে হরিজন সম্প্রদায় থেকে উঠে এসে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া এটাই সানি দাসকে করেছে অনন্য। স্থানীয়দের দাবি, এই সম্প্রদায় থেকে তিনিই প্রথম ফুটবলার, যিনি জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাফল্যের অংশীদার হয়েছেন।

ফাইনাল খেলার দিন তার এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। টেলিভিশনের সামনে জড়ো হয়ে সবাই একসঙ্গে খেলা উপভোগ করেন। বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর আনন্দে ফেটে পড়েন তারা। যদিও ফাইনালে সানি দাস মাঠে ছিলেন না, তবুও তাদের কাছে এই জয় মানেই সানি দাসের জয়।

সানি দাসের বাবা রাজ্জাক দাস নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের একজন কর্মচারী এবং মা মুক্তা রানী একজন গৃহিণী। তারা যৌথ পরিবারে বসবাস করেন। পরিবারের সদস্যদের মতে, ছোটবেলা থেকেই সানির মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আলাদা ঝোঁক ছিল।

তার চাচী আনন্দী রানী বলেন, “ছোট থেকেই খেলাধুলার প্রতি ওর প্রবল আগ্রহ ছিল। আমরা পড়াশোনার জন্য চাপ দিলেও সে মাঠেই বেশি সময় কাটাত। অনেক সময় খাওয়া-দাওয়া ভুলে যেত। এখন সে জাতীয় দলে খেলছে এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।”

পরিবারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তার চাচা নয়ন দাস। এলাকায় অনেকেই সানিকে নয়ন দাসের ছেলে হিসেবেই চেনেন। সানির বেড়ে ওঠা এবং খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে তার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

নয়ন দাস বলেন, “আমি নিজেই তাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেছি। তার কোচ সবসময় বলতেন, ছেলেটার সম্ভাবনা আছে তাকে সুযোগ দিতে হবে। আমরা সবসময় পাশে ছিলাম। এখন সে জাতীয় দলে খেলছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের।”

তিনি আরও জানান, হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তান হয়েও সানি কোথাও বৈষম্যের শিকার হয়নি এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

সানির বড় ভাই সঙ্গীত দাস বলেন, “আমরা দুই ভাই অনেক কষ্ট করে খেলাধুলা করেছি। ছোট ভাইটা ভালো খেলতো, তাই তাকে সবসময় সাপোর্ট দিয়েছি। আজ সে জাতীয় দলে এটা আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি পুরো হরিজন সম্প্রদায়ের জন্যও সম্মানের।”

মা মুক্তা রানী বলেন, “আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তানরা ভালো কিছু করুক। সে পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী ছিল না, কিন্তু খেলাধুলায় সফল হয়েছে। দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

সানি দাসের কোচ আজমল হোসেন বিদ্যুৎ জানান, হরিজন সম্প্রদায় থেকে ফুটবলে উঠে আসা সহজ নয়। তিনি বলেন, “এই এলাকায় অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকে। সানিকে তার চাচা আমার কাছে নিয়ে আসেন। শুরু থেকেই ওর মধ্যে দৃঢ় সংকল্প ছিল। নিয়মিত অনুশীলন করেছে, কখনো হাল ছাড়েনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের একাডেমী থেকে অনেকেই জাতীয় দলে খেলেছে, তবে সানি আলাদা। সে সব বয়সভিত্তিক দলে খেলেছে এবং নিজের জায়গা তৈরি করেছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অনেকেই জাতীয় দলে খেলেছে, কিন্তু হরিজন সম্প্রদায় থেকে সানিই প্রথম। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।”