ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ স্তিমিত হয়েছে। পোস্টার-ব্যনার নামানো হয়েছে, মিছিলের স্লোগান থেমেছে। এখন শুরু হয়েছে ভিন্ন এক প্রতিযোগিতা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনেই এসেছে নতুন নেতৃত্ব। ভোটের লড়াই শেষ হলেও সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা জনপ্রত্যাশা পূরণের।
জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত। যানজট, জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, পরিবেশ দূষণ, নদী দখল, চাঁদাবাজি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাই নবনির্বাচিত পাঁচ সংসদ সদস্যের দিকে এখন তাকিয়ে আছে সাধারণ মানুষ। যদিও এখনো পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা দৃশ্যমান হয়নি, তবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় ঘুরে ঘুরে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছেন, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং মাঠ গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পাঁচ এমপির মধ্যে চারজনই প্রথমবারের মতো সংসদে গেছেন। ফলে তাদের সামনে রয়েছে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ সংসদীয় কার্যক্রমে সক্রিয় থাকা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সামাল দেওয়া এবং একই সঙ্গে স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন উদ্যম যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে দ্রুত সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও এবারই প্রথম সংসদে প্রবেশ করলেন তিনি। দ্রুত নগরায়ণ, আবাসন প্রকল্পের বিস্তার এবং শিল্পায়নের ফলে রূপগঞ্জে অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গ্যাস-বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহ এসব এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি। দিপুর সামনে বড় কাজ হবে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে এলোমেলো নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণে আনা।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে বিএনপির নজরুল ইসলাম আজাদ ১ লাখ ২৪ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও সংসদে এটিই তার প্রথম মেয়াদ। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে সড়ক অবকাঠামো, সেচব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এসব প্রশ্নে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অনেক। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় আধুনিক উদ্যোগ নিলে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁ) আসনে বিএনপির আজহারুল ইসলাম মান্নান ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকার মিশ্র এই আসনে পরিবেশ দূষণ, কারখানার নিরাপত্তা, শ্রমিক কল্যাণ ও কর্মসংস্থান বড় ইস্যু। বিশেষ করে নদী ও খাল দখল, বায়ুদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। মান্নানের প্রতি প্রত্যাশা শিল্পোন্নয়ন বজায় রেখে পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (সদর উপজেলার একাংশ) আসনে ১১-দলীয় জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বয়সে তুলনামূলক তরুণ এই এমপির বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নগর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এবং চাঁদাবাজি দমনে দৃশ্যমান পদক্ষেপের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি এ আসনে। তরুণ নেতৃত্বের কাছে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও দৃশ্যমান ফল চান ভোটাররা।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত আবুল কালাম ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এর আগে তিনবার সংসদ সদস্য থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বন্দর ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির এ এলাকায় সড়ক উন্নয়ন, নদী রক্ষা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ দেখতে চান বাসিন্দারা। অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবেন এমন প্রত্যাশা রয়েছে তার প্রতি।
বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে আছে। নদীদূষণ, অবৈধ দখল, ভাঙাচোরা সড়ক ও অপরিকল্পিত নগরায়ন এসব সমস্যা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমাধান করতে হবে। সংসদে জেলার প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচজনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে টেকসই পরিবর্তন কঠিন হবে।
নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো এখন বাস্তবতার মুখোমুখি। মাঠ গোছানোর প্রাথমিক পর্ব শেষ হলে উন্নয়ন কার্যক্রম কতটা গতি পায়, সেটিই হবে মূল প্রশ্ন। নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা স্পষ্ট রাজনীতির দ্বন্দ্ব নয়, দরকার কার্যকর পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, নতুন পাঁচ এমপি কত দ্রুত আস্থা অর্জন করে শিল্পনগরীর দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেন।

































আপনার মতামত লিখুন :