নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। একদিকে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে মহানগর বিএনপি, অন্যদিকে সেই কর্মসূচি ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন গণসংহতি আন্দোলন, এনসিপির নেতাকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী। এর ফলে মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ, যা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
গত ১ আগস্ট বিকেলে শহরের মিশনপাড়া এলাকার হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সামনে থেকে মহানগর বিএনপির উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি চাষাঢ়া ও নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব এলাকা প্রদক্ষিণ করে শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের আগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিএনপির নেতারা এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলটির কয়েকজন নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এনসিপির নেতারা অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি রাজনীতি করেছে। তাই কটূক্তি কিংবা মিথ্যাচারের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা সম্ভব নয়।
বক্তারা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তিনি জেলায় এলে প্রতিহত করারও হুঁশিয়ারি দেন। তাদের ভাষ্য, এনসিপির মতো একটি “কথিত বাণিজ্যিক দল” ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, দেশের কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক তারেক রহমানকে নিয়ে মন্তব্য করার আগে রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজি ও নাটকের রাজনীতি পরিহার করে এনসিপির নেতাদের সংযত থাকা উচিত। অন্যথায় সাধারণ মানুষই এর জবাব দেবে।
বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ রেজা রিপন, আনোয়ার হোসেন আনু, সদস্য আওলাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদ, সদর থানা বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা এবং বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
তবে বিএনপির এই কর্মসূচি ও বক্তব্যের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া। গণসংহতি আন্দোলনের নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক তরিকুল সুজন ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, অতীতে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিরোধী মতকে দমন করতে চেয়েছিল, বর্তমানেও একই ধরনের ভাষা ও হুমকি রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। তাই ঘৃণার রাজনীতি কিংবা বিরোধী মতকে দমনের সংস্কৃতি কোনোটিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একইসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, ঘৃণার রাজনীতি কিংবা বিরোধী মতকে “পিষে ফেলার” রাজনীতি কোনোটির জন্যই জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রাণহানি ঘটেনি। নারায়ণগঞ্জে ভয়ভীতি কিংবা পেশিশক্তির রাজনীতি মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এনসিপির সংগঠক শওকত আলীও ফেসবুকে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, বিএনপির নেতারা যদি সত্যিই এনসিপিকে “পিষে মারার” কথা বলে থাকেন, তবে সেটি রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিপন্থী। একইসঙ্গে তিনি বিএনপির কর্মসূচির উপস্থিতি নিয়েও কটাক্ষ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, এমন বক্তব্যে তাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ আছে কি না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীরব রায়হান নামে আরেক রাজনৈতিক কর্মীও দীর্ঘ একটি প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, অতীতে আওয়ামী লীগও বিরোধী মত দমনের জন্য একই ধরনের বক্তব্য দিত। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে যদি অন্য রাজনৈতিক শক্তিও একই পথ অনুসরণ করে, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ হবে না। তার ভাষ্য, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে ভয়ভীতি কিংবা প্রতিপক্ষকে দমনের রাজনীতির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। মাঠের কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, হুঁশিয়ারি ও উসকানিমূলক ভাষার পরিবর্তে সংলাপ ও রাজনৈতিক সহনশীলতার চর্চা জোরদার না হলে স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

































আপনার মতামত লিখুন :