নানা ঘটনা, উত্তেজনা ও রাজনৈতিক-সামাজিক আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এপ্রিল মাস। তবে নারায়ণগঞ্জে পুরো মাসজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল হকার উচ্ছেদ, পুনর্বাসনের দাবি এবং নগরজীবনে শৃঙ্খলা ফেরানোকে ঘিরে চলমান বিতর্ক। মাসজুড়ে নানা ঘটনা ঘটলেও নগরবাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং এর বিপরীতে হকারদের ধারাবাহিক আন্দোলন।
দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত ও সড়ক দখল, যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ এবং নগর বিশৃঙ্খলা ছিল সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই পরিস্থিতিতে ১৩ এপ্রিল চাষাঢ়া জিয়া হল এলাকা থেকে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযান নতুন বাস্তবতার সূচনা করে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযান শুধু ফুটপাত দখলমুক্ত করার পদক্ষেপ নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অভিযানের পর থেকেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, জীবিকার প্রশ্ন তুলে পুনর্বাসনের দাবিতে হকারদের একটি অংশ বারবার রাজপথে নেমেছে। এপ্রিলের বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু আন্দোলন চললেও ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার প্রশ্নে প্রশাসনের অবস্থানে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলেনি।
নগরবাসীর বড় অংশের দৃষ্টিতে এই উচ্ছেদ অভিযান ছিল বহুদিনের ভোগান্তি থেকে স্বস্তির শুরু। কারণ বছরের পর বছর ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে চলাচল করতে হয়েছে, যা বাড়িয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী, নারী ও প্রবীণদের জন্য শহরে নিরাপদ চলাচল কঠিন হয়ে উঠেছিল। ফলে সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেকে নগর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তবে বিষয়টির মানবিক দিকও রয়েছে। আন্দোলনরত হকারদের দাবি, তাদের অনেকের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ফুটপাতকেন্দ্রিক ব্যবসা। তাই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করলে জীবিকা সংকট আরও বাড়বে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করা না গেলেও প্রশাসনের ভাষ্য, পুনর্বাসনের প্রশ্ন বিবেচনায় থাকতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত পুনরায় দখলের সুযোগ হতে পারে না।
এপ্রিলের শেষদিকে এসে হকার আন্দোলনে রাজনৈতিক সমর্থনের দৃশ্যমান উপস্থিতিও কিছুটা কমে যায়। শুরুতে কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর সক্রিয়তা দেখা গেলেও পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে সেই উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, জনমতের বড় অংশ ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রকাশ্য সমর্থনে ভাটা পড়েছে।
যদিও উচ্ছেদের পরও শহরের কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে হকার বসার চেষ্টা প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় মাঝে মধ্যে হকারদের ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করছে, সুযোগ পেলে পুরোনো অবস্থায় ফেরার চেষ্টা এখনো থেমে নেই। ফলে প্রশাসনের জন্য ধারাবাহিক নজরদারি এখন বড় পরীক্ষা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যু শুধু উচ্ছেদ বনাম আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান, সামাজিক বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। সাখাওয়াত হোসেন খানের জন্য এটি নগর ব্যবস্থাপনায় নিজের অবস্থান দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত পুনর্বাসন, বিকল্প বাজার এবং কার্যকর নীতি।
সব মিলিয়ে এপ্রিল মাস নারায়ণগঞ্জে হকার ইস্যুকেই সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত করেছে। একদিকে জীবিকার প্রশ্ন, অন্যদিকে নাগরিক স্বস্তি, এই দুই বাস্তবতার সংঘাতে শহর এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে। তবে আপাতত স্পষ্ট, প্রশাসন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার সিদ্ধান্তে অনড়, আর নগরবাসীর বড় অংশও চাইছে ফুটপাত পথচারীর জন্যই থাকুক, দখলের জন্য নয়।


































আপনার মতামত লিখুন :