সরকার পরিবর্তনের পর সময় গড়ালেও নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি| একসময় যাদের উপস্থিতিতে শহর থেকে উপশহর পর্যন্ত রাজপথ সরগরম থাকত, সেই সংগঠন এখন যেন নীরবতা আর অনিশ্চয়তার ভেতরে আটকে আছে| মামলা, গ্রেপ্তার এবং আত্মগোপনের আতঙ্কে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে|
রাজনৈতিক অঙ্গণে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি| সাবেক সিটি মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং নাসিকের সাবেক কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতিসহ একাধিক নেতাকর্মীর গ্রেপ্তারের ঘটনায় তৃণমূল পর্যায়ে ভীতির পরিবেশ ˆতরি হয়েছে| এই পরিস্থিতি শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রম থামিয়ে দেয়নি, বরং নেতাকর্মীদের মনোবলেও বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে|
একই সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের দেশত্যাগের বিষয়টি সংগঠনের ওপর আরও গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা| দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই পরিবারের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| তার অনুসারীদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের রাজনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে|
তবে এই সংকটের ভেতরেও ব্যতিক্রম ছিলেন আইভী| ক্ষমতার পালাবদলের পরও তিনি শহরের দেওভোগ এলাকায় নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটিরে’ অবস্থান করে দলীয় যোগাযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন| নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের মনোবল জোগানোর চেষ্টা ছিল দৃশ্যমান| কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় জড়ানো এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এলাকা না ছাড়ায় শেষ পর্যন্ত তাকেও গ্রেপ্তার হতে হয়| তার গ্রেপ্তারের পর সংগঠনের ভেতরে যে শেষ ভরসার জায়গাটি ছিল, সেটিও অনেকটা ভেঙে পড়ে|
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি| সংগঠনটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী নেতার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল| ফলে একে একে সেই নেতাদের অনুপস্থিতিতে পুরো সংগঠনই কার্যত পঙ্গু হয়ে গেছে|
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বাস্তব চিত্র আরও কঠিন| অনেকেই মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে আছেন| প্রকাশ্যে আসতে সাহস পাচ্ছেন না কেউ কেউ| আবার অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, ফলে জীবিকার সংকটেও পড়তে হচ্ছে| তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা ছিল পরিচয়ের গর্ব, এখন সেটিই হয়ে উঠেছে ঝুঁকির কারণ|
অন্যদিকে শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে| কলকাতা, লন্ডন ও দুবাইয়ে তাদের নিরাপদ অবস্থান নিয়ে তৃণমূলের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে|
অনেক কর্মীর অভিযোগ, যারা একসময় মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারাই এখন নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন| ফলে ঝুঁকির ভারটা পুরোপুরি তৃণমূলের ওপরই এসে পড়েছে|
এই বাস্তবতার সঙ্গে অতীতের চিত্রের রয়েছে তীব্র ˆবপরীত্য| সরকার পরিবর্তনের আগের সময়টাতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ছিল নিয়মিত দৃশ্য| ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে এমন স্লোগানে মুখর ছিল রাজপথ| কিন্তু সেই উদ্দীপনা এখন পুরোপুরি অনুপস্থিত| রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই আগের সেই গতি বা দৃশ্যমান উপস্থিতি|
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান অচলাবস্থা কেবল সাময়িক সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের নেতৃত্ব সংকটেরও পূর্বাভাস দিচ্ছে| নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না| বরং তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা, বিভক্তি এবং অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে|
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এখন এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করছে| যে শহরের অলিগলি একসময় দলীয় ব্যানার-ফেস্টুন আর স্লোগানে ভরপুর ছিল, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা| ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল সংগঠনটি, সেই ভিত্তিই এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দেখা দিয়েছে|



































আপনার মতামত লিখুন :