দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত যখন ধীরে ধীরে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত হতে শুরু করেছিল, তখন নগরবাসীর মনে জন্ম নিয়েছিল নতুন এক আশা। বহু বছরের যানজট, বিশৃঙ্খলা ও ফুটপাত দখলের সংস্কৃতি থেকে হয়তো এবার মুক্তি মিলবেএমন প্রত্যাশাই তৈরি হয়েছিল সবার মধ্যে। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উচ্ছেদ অভিযানের কয়েক মাস না পেরোতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও হকারদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। ফলে নগরবাসীর মনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে হকারমুক্ত শহরের যে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল, সেটি কি আবারও দখলের ছায়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
এক সময় নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত এমনভাবে হকারদের দখলে ছিল যে পথচারীদের হাঁটার জায়গাই থাকত না। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, নারী, শিশু এবং বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচল করতেন। এতে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ত, তেমনি সৃষ্টি হতো তীব্র যানজট। শহরের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক নগরজীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান দায়িত্ব গ্রহণের পর হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন। গত ১৩ এপ্রিল চাষাঢ়া এলাকার জিয়া হলের সামনে অভিযান শুরু হওয়ার পর একে একে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা এবং নাগরিক সমাজের সমর্থনে অভিযানটি নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
অভিযানের পর ফুটপাতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ ফিরে পান সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন পর পথচারীদের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত হওয়ায় অনেকেই প্রশাসনের এ উদ্যোগকে সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে মূল্যায়ন করেন। শহরের যান চলাচলেও কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু সেই ইতিবাচক পরিস্থিতি খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সম্প্রতি শহীদ মিনার এলাকা, চাষাঢ়া ও আশপাশের বিভিন্ন সড়কে আবারও হকারদের বসতে দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির মধ্যেই হকাররা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতা কি আগের মতো রয়েছে, নাকি ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ছে?
নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ নাগরিকই হকারদের জীবিকার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু সেই মানবিকতার অর্থ ফুটপাত দখলের অনুমতি নয়। তাদের মতে, জীবিকার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদ চলাচলের অধিকারও সমানভাবে রাষ্ট্রের নিশ্চিত করার দায়িত্ব। পরিকল্পনাহীনভাবে ফুটপাতে ব্যবসা বসতে দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ পথচারীরাই।
এদিকে হকারদের পক্ষ থেকেও পুনর্বাসনের দাবি দীর্ঘদিনের। গত ২০ এপ্রিল পুনর্বাসনের দাবিতে একটি অংশ বিক্ষোভ মিছিল করে। পরে ২৬ এপ্রিল একই দাবিতে মানববন্ধন ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে আগের তুলনায় এসব কর্মসূচিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থনের উপস্থিতি ছিল অনেকটাই সীমিত। অনেকের মতে, নগরবাসীর বড় অংশ এখন ফুটপাত পুনর্দখলের চেয়ে পরিকল্পিত পুনর্বাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, হকার সমস্যা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নগর পরিকল্পনার বিষয়। বহু নি¤œআয়ের মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমস্যা সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তাদের মতে, নির্দিষ্ট হকার জোন, আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র থেকে শহর বের হতে পারবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অনেক নাগরিক বলছেন, "ফুটপাত পথচারীর জন্য, ব্যবসার জন্য নয়।" আবার অনেকে মনে করছেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। অর্থাৎ একদিকে নাগরিক স্বার্থ, অন্যদিকে জীবিকার বাস্তবতা এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলে শুধু পথচারীর নিরাপত্তাই নিশ্চিত হয় না, যানজটও কমে, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ে এবং নগরের সামগ্রিক পরিবেশ উন্নত হয়। তাই এ বিষয়টিকে কেবল হকার উচ্ছেদের প্রশাসনিক অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা একটাই যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেটি যেন মাঝপথে থেমে না যায়। সাময়িক অভিযানের বদলে স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে ফুটপাত পথচারীদের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হোক। কারণ একটি শহরের শৃঙ্খলা শুধু রাস্তা পরিষ্কার রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন উচ্ছেদের পর দখলমুক্ত অবস্থা কতটা কার্যকরভাবে ধরে রাখতে পারে। কারণ নারায়ণগঞ্জবাসী আর আগের বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরতে চান না। তারা এমন একটি শহর চান, যেখানে সহানুভূতি থাকবে জীবিকার প্রতি, কিন্তু সেই সহানুভূতির আড়ালে নাগরিক অধিকার আর কখনোই দখল হয়ে যাবে না।


































আপনার মতামত লিখুন :