News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

আবারও বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম আবারও বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। একের পর এক খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক বিস্তার, প্রকাশ্যে হামলা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর সংঘবদ্ধ আক্রমণের ঘটনায় নগরজীবনে তৈরি হয়েছে চরম অনিরাপত্তাবোধ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ মানুষ এখন দিন-রাতের চলাফেরাতেও শঙ্কা অনুভব করছেন। বিশেষ করে গত চার মাসে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নিরাপদ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে মাদক কারবার, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধ। নগরবাসীর অভিযোগ, অপরাধীরা এখন অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিকেও তারা তোয়াক্কা করছে না। রাত গভীর হলেই শহরের কিছু এলাকা কার্যত ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গত চার মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অন্তত ৮বার হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ গত ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের সাতভাইয়াপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের অভিযোগে এক আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন তিন পুলিশ সদস্যসহ চারজন। আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন সোনারগাঁ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুরুজ্জামান, কনস্টেবল শাহীন ও মাইনুল এবং পুলিশ সোর্স মাসুম মিয়া। তারাঁ সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। আহত এসআই সুরুজ্জামান জানান, উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সাতভাইয়াপাড়া এলাকায়  তিনি দুই কনস্টেবল শাহীন ও মাইনুলকে সঙ্গে নিয়ে মহাসড়কে বিভিন্ন মোটরসাইকেল ও পিকআপ ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্ধার অভিযান ও এক আসামি ধরতে যায় পুলিশ। এ সময় আসামি সাগর ও তার ভাই  সজল দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তিন পুলিশ সদস্য ও পুলিশ সোর্স মাসুমকে কুপিয়ে জখম করেন। খবর পেয়ে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করেন। তাঁদের মধ্যে তিন পুলিশ সদস্যকে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পুলিশ সোর্স মাসুমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

গত ২ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জামতলা ধোপাপট্রি এলাকায় সাদা পোশাকে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন দুই পুলিশ সদস্য। এসময় পুলিশের দুই সোর্সকেও মারধর করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সাদা পোশাকে ফতুল্লা মডেল থানার এসআই খাইরুল বাশার ও কনেস্টেবল আরিফুল ইসলাম দুজন সোর্সকে সঙ্গে নিয়ে ধোপাপট্রি এলাকায় আইনজীবীর বাড়ি নামে ওই বাড়িতে অভিযান চালান। অভিযোগ রয়েছে, এসময় তাদের মধ্যে কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম আলমারির একটি ড্রয়ার থেকে স্বর্ণের একটি চেইন তার পকেটে ভরে নেন। বিষয়টি বাড়ির লোকজনের চোখে পড়লে তাদের কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চান। তখন তারা পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি। এমন অভিযোগ তুলে কিছু বাড়ির মানুষের ডাক-চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন তাদের ঘরে গিয়ে ৪ জনকে গণপিটুনি দেন। এরপর জরুরি নাম্বারে থানায় ফোন করলে পুলিশ গিয়ে ৪ জনকে উদ্ধার করে।

গত ৬ মে ফতুল্লার কাশিপুরের হাশেমবাগ এলাকায় অভিযানে গিয়ে একদল পুলিশের সদস্য অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। এ সময় আটক পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। যদিও ওই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য আহত হননি, তবে ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

এর আগের দিন, ৫ মে, শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে র‌্যাব সদস্যরা হামলার শিকার হন। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারসহ ১৩ জনকে আটক করা হয়।

একই দিন গভীর রাতে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় পুলিশের গাড়ি থেকে একাধিক মামলার আসামি শামীমকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ওই ঘটনায় জড়িত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরও আগে গত ৩০ এপ্রিল বন্দরের পুরান বন্দর এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। হামলায় এক কনস্টেবলের আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

গত ১৫ মার্চ শহরের উকিলপাড়া রেললাইন এলাকায় দুই পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে রাতেই অভিযানে নেমে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আরও আগে, ৯ মার্চ ভোরে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই লুৎফর রহমানকে কুপিয়ে তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, অপরাধীরা এখন শুধু সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে আতঙ্ক। অনেকেই বলছেন, এখন আর কেউ নিরাপদ বোধ করছেন না।

শহরের আমির হোসেন নামের এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে হামলার শিকার হচ্ছে, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কারা? পুলিশই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ থাকবে?”

ইমন হোসেন নামের আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, “রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরার সময় এখন ভয় লাগে। মোবাইল, টাকা কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়।