News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

সন্ত্রাসের জনপদে এবার আলোচনায় মাদকের সয়লাবের নগরী


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম সন্ত্রাসের জনপদে এবার আলোচনায় মাদকের সয়লাবের নগরী

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে খ্যাত ছিলো নারায়ণগঞ্জ। একসময় এখানকার বাসিন্দাদের সকালে ঘুম ভাঙতো গুলির আওয়াজে। সেই সাথে প্রতিদিনই লাশের খবর মিলতো। এই সন্ত্রাসের জনপদের সাথে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে মাদকের সয়লাবের নগরীতে। এখানকার বিশিষ্টজনরা বলতে শুরু করছেন হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এই মাদক ব্যবসায়ীরা যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন।

এই মাদক ব্যবসায়ীদের কোনোভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর এই মাদককে কেন্দ্র করেই সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত এই মাদক ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। কয়েকদিন পরপরই মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান করতে গেলেই তাদের উপড় হামলা করা হচ্ছে।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণামূলক সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ও কর্মসংস্থান খাতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ২৬ জানুয়ারি রাতে সোনারগাঁর কাঁচপুর বালুর মাঠে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রতিশ্রুতি দেন।

সেদিন তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘গত কয়েক বছরে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি অপরাধের বিচার দেশের প্রচলিত আইনে নিশ্চিত করা হবে। দখলবাজি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।

‘দুর্নীতি ও মাদক’ সমাজের প্রধান শত্রু মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর আশপাশে মাদকের ২০টি স্পট রয়েছে। এখানে মাদক ব্যবসার যে বিস্তার ঘটেছে, তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তার এই বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জে বেশ সাড়া ফেলেছিলো। সে সময় থেকেই এসকল মাদক স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবী  উঠে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই নিবাচনের পরপরই এসকর স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবি দিন দিন জোড়ালো হয়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আর এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদক নিয়ে পরিস্থিতির কতটা উন্নয়ন হয়েছে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বিএনপির চেয়ারপার্সন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্ণনায় নারায়ণগঞ্জের ২০ টি মাদক স্পট নিয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। তিনি বলেছিলেন, আমরা প্রতিনিয়ত মাদক স্পটগুলোতে অভিযান পরিচালনা করছি।

গত ২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে এসে কিছু মাদক স্পটের কথা বলেছিলেন। সে সকল স্পট নিয়ে আমরা করছি। আমরা মাদক ব্যবসায়ী এবং ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করছি। আমরা এদেরকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। আশা করছি আমরা শীঘ্রই জিরো অবস্থানে নিয়ে আসতে পারবো। আমাদের পুলিশ সদস্যরা সারারাত অভিযান পরিচালনা করছেন।

কিন্তু পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর এই বক্তব্যের কোনো সুফল পাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জবাসী। বিভিন্ন মহল তাদের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না।

এরই মধ্যে এক প্রতিক্রিয়ায় সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, বাড়িওয়ালা অভিযোগ করে মাসদাইর এলাকা এখন ভাড়াটিয়ারা থাকতে চায় না। অবস্থা এরকম হয়েছে। পুলিশ মার খায় এটা কষ্ট লাগে। যে এলাকা নিরাপদ ছিলো সেখানে পুলিশ মার খায়। পুলিশ মার খেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এখানে ষ্পেশালভাবে নজরদারি করা উচিত। এখানে বিশেষ টিম গঠন করে অভিযান পরিচালনা করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই। 

তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছে নারায়ণগঞ্জে মাদকের স্পট আছে। তারপরও প্রশাসনের কান গরম হয় না। আমরা কিভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করেছি এটা নারায়ণগঞ্জবাসী জানে। আর এখন নারায়ণগঞ্জ চাঁদাবাজি আর মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্য হয়ে গেছে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরা হচ্ছে না।

এদিকে একটি প্রোগ্রামে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাসুকুল ইসলাম রাজীব বলেছেন, অপ্রিয় হলেও সত্য অনেকে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন প্রতিবাদ করেন কিন্তু পর্যালোচনা করে দেখা যায় সে নিজেই সরাসরি সম্পৃক্ত। নৈতিক স্খলন ঘটেছে আমাদের সমাজে; এটা মাদকাসক্তির একটা মূল কারণ। পারিবারিক শিক্ষাগুলোর ক্ষেত্রে আমরা অনেক আধুনিক হয়ে গেছি। প্রশাসনের লোকজন যথেষ্ট আন্তরিক। মাদকের ব্যবসাটা অনেকের কাছে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে। এখন ধরাই যায় না কেউ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। অনেক শিক্ষিত মানুষ মাদক কারবারির সাথে জড়িত। অনেক ভালো মানুষ আছে মাদকের সাথে সম্পৃক্ত।

একই সাথে একটি সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবিএম সিরাজুল মামুন বলেছেন, এখন হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। মাদক চাঁদাবাজি কেন নির্মূল হয় না। এর আসল কারণ যারা নেতৃত্বে আছেন তারা ওদেরকে শেল্টার দেয়। মাদক ব্যবসায়ী চাঁদাবাজ কিন্তু বেশি না। কিন্তু তারা শেল্টারে থেকে মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠা করে তুলছে। অনেকেই চায় না মাদক নির্মূল হোক। তারা চায় মাদক নিয়ন্ত্রণ হোক। মাদক নিয়ন্ত্রণ নয় নির্মূল করতে হবে।

একই সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের মহানগর সহ-সাধারণ সম্পাদক মুফতী শেখ শাব্বীর আহমাদ বলেছেন, সারাদেশেই পত্রিকা খুললেই মাদক ছিনতাই সন্ত্রাস। পত্রিকার পাতায় পাতায় মাদক ছিনতাই খুনের কথা। কিছুদিন পরপরই এই কাশীপুর এলাকায় খুনের কথা শুনি। সবকিছুর মূলে এই মাদক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন। কোথাও তিনি মাদকের স্পটের কথা বলেন নাই। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে এসে মাদকের ২০ টি স্পটের কথা বলেছেন। তার কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা; তারেক রহমান সাহেব আপনি নারায়ণগঞ্জের জন্য কি পদক্ষেপ নিয়েছেন। এটা আমাদের জানার দরকার আছে। আপনি জনগণের দায়িত্ব আদায়ের জন্য বসেছেন। কি পদক্ষেপ নিয়েছেন এটা জানার অধিকার জনগণের আছে।

তিনি আরও বলেন, কাশীপুর নয় শুধু সর্বত্রই এলাকার সবচেয়ে সমস্যা মাদকের সমস্যা। সকলেই এক কথা বলবে। শ্রমিকরা বলবে ছিনতাইয়ের সমস্যা। গার্মেন্টস থেকে বের হলে মহিলাদেরকে ধরে নিয়ে ছিনতাই করে। প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অলি গলিতে মাদকের ছড়াছড়ি; কিশোর গ্যাংয়ের তান্ডবে এলাকার মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারছে না। বিএনপির অফিসেও মাদক কারবারিরা হামলা করে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

এভাবে সকলের মুখে মুখে নারায়ণগঞ্জে মাদকের সয়লাব কথাটি উঠে আসছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোড়ালো প্রদক্ষেপ চায় সমাজের বিশিষ্টজনরা।