নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলায় অক্টো অফিসের বিপরীতে ফের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ১৮ জুলাই ভোরে ওই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। মটরসাইকেলে করে আসা একদল ছিনতাইকারী একটি অটো রিকশা আটকে ছিনতাই করে। পরে লোকজন এগিয়ে আসলে তারা পালিয়ে যায়।
এদিকে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে এখন যেন পথে বের হওয়াটাই অনেকের কাছে এক ধরনের মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন কিংবা রাত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা। কর্মস্থলে যাওয়া, ব্যবসা পরিচালনা করা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে বের হওয়া সবকিছুর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে একটি প্রশ্ন, নিরাপদে গন্তব্যস্থলে যাওয়া নিয়ে। সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন এলাকায় পথরোধ করে মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখায়, আবার কোথাও শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের দিকে ফাঁকা সড়কগুলোতে অপরাধীদের তৎপরতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
নগরীর চাষাঢ়া, উকিলপাড়া মোড়, নয়ামাটি, মাসদাইর, জামতলা, ইসদাইর, দেওভোগ, জিমখানা রেলওয়ে কলোনি এলাকা, ডিসি বাংলোর সামনের সড়ক, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড এবং শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী ওয়াকওয়ে এসব জায়গার নাম বারবার উঠে আসছে স্থানীয়দের অভিযোগে। বাসিন্দাদের দাবি, সন্ধ্যার পর থেকে অনেক এলাকায় একা চলাচল করতে মানুষ ভয় পাচ্ছেন।
একজন পথচারী জানান, আগে রাত করে বাড়ি ফিরতে তেমন সমস্যা হতো না। এখন মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতেও ভয় লাগে। অপরিচিত কাউকে দেখলেই সন্দেহ হয়। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক কাজ করে।
পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে গত মার্চ মাসে নিতাইগঞ্জ এলাকায় দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে সরকারি পিস্তল ছিনতাইয়ের ঘটনার পর। ওই ঘটনা অনেকের মনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে যদি দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যই হামলার শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত। ফতুল্লা, কাশিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সাইনবোর্ড, সানারপাড়, কাঁচপুর, মদনপুর, মেঘনাঘাট টোলপ্লাজা সংলগ্ন এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। রাতের বেলায় যানবাহন থামিয়ে বা পথরোধ করে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায়ই শোনা যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশি টহল চোখে পড়ে না। কোথাও কোথাও রাস্তার আলোর অভাবও অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। এছাড়া ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। তাদের মতে, অভিযোগের প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অনেকেই ঝামেলা এড়িয়ে যান। ফলে বাস্তবে যত ঘটনা ঘটছে, তার সবই আনুষ্ঠানিক নথিতে উঠে আসছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো জরুরি। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত মোবাইল টহল, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশি ব্যবস্থা চালু করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা আরও সরল। তারা বলছেন, শুধু অভিযান বা আশ্বাসে নয়, বাস্তবে রাস্তায় নিরাপত্তার উপস্থিতি দেখতে চান। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের অনেক মানুষের কাছে পথচলা মানেই স্বস্তি নয়, বরং এক ধরনের অজানা আতঙ্ক। আর এই আতঙ্ক যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে শিরোনামের বাস্তবতা পথে নামলেই আতঙ্ক, বাড়ছে ছিনতাইয়ের থাবা।


































আপনার মতামত লিখুন :