এসএসসি পাশ করেছিলেন ১৯৭২ সালের নভেম্বরে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের প্রকৃত সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৫৪ সালে। অথচ নার্সিং ও মিডওয়ারি অধিদপ্তরে চাকরি নেয়ার সময়ে দাখিলকৃত সার্টিফিকেটে ঘষামাজা করে নিজের জন্মতারিখ বদলে করেছিলেন ১৯৬২ সাল। এরপর সেই ঘষামাজা সার্টিফিকেট অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করেন। ঘষামাজা সার্টিফিকেটের ভুয়া জন্মতারিখ দিয়ে পৌনে ৮ বছর বেশী চাকরিও করেন। তবে বিপত্তি বাধে অবসর গ্রহণকালীন সময়ে। নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের প্রয়াত নার্স ফ্রানচিলিয়া গোমেজের ১০ বছরে এসএসসি পাশের সার্টিফিকেট দেখে টনক নড়ে স্বাস্থ্য বিভাগের। এরপর দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে আসে জাল সার্টিফিকেটে প্রয়াত নার্স ফ্রানচিলিয়া গোমেজ ভুয়া সার্টিফিকেটে পৌনে ৮ বছর বেশী চাকুরী করেছিলেন।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ১০ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের শৃঙ্খলা অধিশাখার সিনিয়র সহকারি সচিব মো. মেজবা উদ্দিন হোসেন দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক বরাবরে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের প্রয়াত নার্স ফ্রানচিলিয়া গোমেজ এর এসএসসি এর সনদ যাচাই পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণে চিঠি প্রেরণ করেন। এতে উল্লেখ করা হয় মাত্র ১০ বছর বয়সে ফ্রানচিলিয়া গোমেজ এসএসসি পাশ করেছেন। অর্থাৎ ফ্রানচিলিয়া গোমেজের এসএসসি সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি ১৯৭২ সালের নভেম্বরে এসএসসি পাশ করেছেন। অথচ তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রে ও এসএসসির সার্টিফিকেট জন্ম ১৯৬২ সালের ১৫ এপ্রিল উল্লেখ করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে এসএসসি পাশের বিষয়টি নিয়ে দুদকের ওই চিঠির অনুলিপি প্রেরণ করা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক (প্রশাসন), পরিচালক (স্বাস্থ্য), নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে। ওই চিঠির আলোকে তৎকালীন জেলা সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ ইমতিয়াজ ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির সভাপতি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের তৎকালীন সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডা. মো. এনামুল হক, সদস্য হিসেবে সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা অফিসার মো. আমিনুল হক ও সদস্য সচিব হিসেবে সিভিল সার্জন অফিসের তৎকালীন মেডিকেল অফিসার ডা. মো. শাখাওয়াত হোসেন মনোনীত হন। পরে ওই কমিটি ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করেন অভিযুক্তের এসএসসির সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ডে যাচাই করা আবশ্যক। উপরোন্ত অফিসে দাখিলকৃত সার্টিফিকেটের ফটোকপি এবং কমিটির নিকট দাখিলকৃত মূল সার্টিফিকেটের ভিন্নতা একটি অকাট্য প্রতারণা। অভিযুক্তের জন্মতারিখ ২টি পাওয়া গিয়েছে যা একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অপরাধযোগ্য প্রতারণা। অভিযুক্ত পিআরএল এর আদেশ নিজে ঘষামাজা করে লাম্পগ্রান্ট উত্তোলন করেছেন এবং তা স্বীকার করেছেন। যা সম্পূর্ণরূপে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এরপর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে আবেদনের প্রেক্ষিতে বেরিয়ে আসে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী ফ্রানচিলিয়া গোমেজের জন্মতারিখ ১৭/০৬/১৯৫৪ ইং। শিক্ষাবোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী ফ্রানচিলিয়া গোমেজের ২০১৩ সালের ১৭ জুন পিআরএল এ যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ভুয়া সার্টিফিকেটে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী করে ভুয়া জন্মতারিখ দেখিয়ে ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল পিআরএল এ যান। ওই তদন্ত রিপোটের আলোকে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী জেলা সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবরে প্রেরিত চিঠিতে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের প্রাক্তন নার্সিং সুপারভাইজার ফ্রানচিলিয়া গোমেজের একেকসময় একেকরকম এসএসসি সার্টিফিকেট দাখিল করার কারণে পিআরএল এর বেতন ভাতাদি বন্ধ রয়েছে উল্লেখ করে পত্র দেন। একইভাবে নার্সিং ও মিডওয়ারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরেও চিঠি প্রেরণ করে জেলা সিভিল সার্জন। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কোন জবাব না পেয়ে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর জেলা সিভিল সার্জন আবারো স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের সচিবের বরাবরে সিদ্ধান্ত চেয়ে চিঠি প্রেরণ করেন।
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই উপ হিসাব মহানিয়ন্ত্রক ফারুক আহমেদ ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব একাউন্ট বরাবরে এক চিঠিতে ফ্রানচিলিয়া গোমেজের বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতনদের কোন মতামত বা সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের সার্ভিস স্টেটমেন্ট ও ইএলপিসি ইস্যুকরণ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। ওই চিঠির আলোকে ডেপুটি ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব একাউন্ট নাজনীন নাহার নারায়ণগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার বরাবর এক চিঠিতে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রাপ্তি সাপেক্ষে পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানান। এরপর নারায়ণগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসারও চিঠির মাধ্যমে জেলা সিভিল সার্জনকে বিষয়টি অবহিত করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের স্বামী রিচার্ড সৌরভ দেউরী হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং ৫২৬/২০২৬) দাখিল করেন। ওই রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের সচিবসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে রুল নিশি জারি করেন এবং মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের স্বামী কেন চাকরি হতে অবসর গ্রহণের ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমান ল্যাম্পগ্রান্ট এবং এক বছরের অবসরোত্তর ছুটিসহ পেনসন সুবিধা ও বকেয়া অর্থ কেন পাবেন না জানতে চান।
চলতি বছরের ১৯ মে নারায়ণগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার এক চিঠিতে জেলা সিভিল সার্জনকে জানান রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে দাখিলকৃত সার্টিফিকেট অনুযায়ী ফ্রানচিলিয়া গোমেজের জন্মতারিখ ১৭/০৬/১৯৫৪ অনুযায়ী তার ২০১৩ সালের ১৭ জুন পিআরএল ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ তিনি পিআরএল ছুটিতে যান ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল। ফ্রানচিলিয়া গোমেজ যে জাল সার্টিফিকেট দাখিল করেছিলেন সেটা অনুযায়ী তিনি ৭ বছর ৯ মাস ২৮ দিন বেশী চাকুরী করেছেন। এ হিসেবে ফ্রানচিলিয়া গোমেজ অতিরিক্ত ৫৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৪ টাকা বেশী অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়ে গেছেন। অপরদিকে তিনি ১২ মাসের ছুটি নগদায়ন বাবদ ২ লাখ ২৩ হাজার ২০০ টাকা এবং ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন ববাবদ ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৪৮০ টাকা পাবেন। অর্থাৎ অবসরোত্তর ছুটিসহ পেনসন সুবিধা ও বকেয়া অর্থ কেটে নেয়া হলেও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের জন্মতারিখ অনুুযায়ী মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের কাছে সরকার আরো বেশী টাকা পাওনা থাকে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতনরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেয়ায় জেলা সিভিল সার্জন কিংবা নারায়ণগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
তবে এ বিষয়টি নিয়ে এখন জেলা সিভিল সার্জন ডা. আফম মুশিউর রহমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত নার্স ফ্রানচিলিয়া গোমেজের পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের খন্ডিত অংশ গণমাধ্যমে প্রচার করে তাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুশিউর রহমান বলেন, আমি যোগদানের আগেই পূর্বতন জেলা সিভিল সার্জন ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের প্রাপ্ত সার্টিফিকেট অনুযায়ী মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের দাখিলকৃত সার্টিফিকেটের গড়মিল থাকার বিষয়টি জানিয়ে আমরা উর্ধ্বতনদের একাধিকবার চিঠিও প্রেরণ করেছি। কিন্তু তাদের কোন জবাব না পাওয়ায় আমরাও কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারিনি। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার আমাকে পত্রের মাধ্যমে জানিয়েছেন মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজ ভিন্ন সার্টিফিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫৫ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন। মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের পরিবার আমার সঙ্গে দেখা করতে আসলে আমি তাদেরকে বলি যে আপনারা সেই টাকা জমা দিয়ে আপনাদের পাওয়া টাকা নিয়ে যান। কিন্তু দেখা গেছে আমাদের কথোপকথনের খন্ডিত অংশের রেকর্ড গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। যেখানে উর্ধ্বতনদের নির্দেশে মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের অবসরোত্তর ছুটিসহ পেনসন সুবিধা ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়টি স্থগিত রয়েছে সেখানে আমার কিংবা নারায়ণগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসারের কারোরই মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের পরিবারকে অর্থ কিংবা চেক দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দেখা গেছে মৃত ফ্রানচিলিয়া গোমেজের পরিবার তাদের স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে।




































আপনার মতামত লিখুন :