বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক সহাবস্থানের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও গত দুই বছরে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা তেমন ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে সারাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ। সেই সমীকরণেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বুধবার দুপুরে সরকারি তোলারাম কলেজ ও এর আশপাশ এলাকায় ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে কলেজে আয়োজিত আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাকবিত-া অল্প সময়ের মধ্যেই হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। সংঘর্ষের সময় কলেজের সামনের এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করেন। কিছু সময়ের জন্য ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হয়। সংঘর্ষের পর দুই সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে। মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের দাবি, আলোচনা সভায় উসকানিমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং তাদের কর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। ফলে ঘটনার দায় নিয়ে উভয় পক্ষই একে অপরকে অভিযুক্ত করছে।
কলেজ প্রশাসনের ভাষ্যও বলছে, অনুষ্ঠান চলাকালে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর কলেজ গেটের বাইরে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ জানিয়েছে, আলোচনা সভায় বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাকবিত-া এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় রূপ নেয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পুরো ঘটনা নিয়েই আলোচনা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্রিয়তা বেড়েছে। ফলে কোথাও কোথাও প্রভাব বিস্তার, কর্মসূচি আয়োজন কিংবা মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনাও সামনে আসছে।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের অভিমত, ছাত্ররাজনীতির নামে সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি বন্ধে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের পাশাপাশি কলেজ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তোলারাম কলেজের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সহাবস্থান, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন সবার প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং শিক্ষাঙ্গণ আবারও স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরে পাবে।

































আপনার মতামত লিখুন :