গত কয়েকদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের দালাল বা দোসর কথাটিকে নিয়ে বেশ জলগোলা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ডিআইটি এলাকায় মহানগর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এর উৎপত্তি হয়। সেদিন সমাবেশে নেতাদের সাথে দাঁড়ানো নিয়ে নিয়ে বিএনপির প্রবীন নেত্রী রাশিদা জামালকে আওয়ামী লীগের দালাল বলে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও সাবেক মেয়র আইভীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আফসানা আফরোজ বিভা। পরবর্তীতে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে এর জোরালো প্রতিবাদ করেন রাশিদা জামাল এর ছেলে ও মহানগর যুবদলের প্রথম সদস্য রাফি উদ্দিন আহম্মেদ রিয়াদ। এসময় তিনি আফসানা আফরোজ বিভাকে আওয়ামী লীগের দোসর সাবেক মেয়র আইভীর ঘনিষ্ঠজন আখ্যায়িত করে এসব অভিযোগের যুক্তি তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে প্রচারিত এসব সংবাদের প্রেক্ষিতে স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভার প্রকাশিত ছবি সম্পর্কে একটি মাদক বিরোধী সভায় বিভা বলেছেন, আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে উন্নয়নের স্বার্থে মেয়র আইভীর সাথে থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আমি অংশ নেইনি।
বিভার দেওয়ার এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রাফি উদ্দিন রিয়াদ সময়ের নারায়ণগঞ্জকে বলেন, যদি তিনি আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে থাকেন তাহলে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বিভার মুখে সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম বাবু কেক তুলে দিচ্ছেন সেটা কি ছিল? মেয়র আইভীর সাথে ভারতের আজমীর শরীফে যাওয়া কি ছিলো? গোপালগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন এসব কি দলীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচি না? জনপ্রতিনিধিত্ব এবং উন্নয়নের দোহাই দিয়ে উনি যখন সাবেক মেয়র আইভী ও ডিবি হারুনের সাথে ভারতের আজমীর শরীফ ছিলেন, নজরুল ইসলাম বাবুর হাতে কেক খেয়েছেন তখন আমরা রাজপথে আন্দোলন করেছি। পলাতক জীবনযাপন করেছি, জেলা খেটেছি, বাবা জামাল উদ্দিন কালুকে ডান্ডাবেড়ি পড়ানো হয়েছে। মা রাশিদা জামাল ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে কারাভোগ করেছে, আদালতের বারান্দায় ঘুরেছে হাজিরা দিতে। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের হাসিনা বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাশিদা জামালের পরিবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আন্দোলন-সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জামাল উদ্দিন কালুর সময় থেকে রাফিউদ্দিন আহমেদ রিয়াদের সময় পর্যন্ত এই বাড়িটিই ছিল বিএনপির অঘোষিত কার্যালয়। দুঃসময়ে অসংখ্য নেতাকর্মীর আশ্রয়, সাহস ও প্রেরণার ঠিকানা ছিল আমাদের বাড়ি। আন্দোলনের ময়দানে আমার বাবা জামাল উদ্দিন কালু গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন। রাশিদা জামাল নিজেও দুইবার কারাবরণ করেছেন। আমি অসংখ্যবার কারাবন্দী হয়েছি। আমার বিরুদ্ধে পঞ্চাশেরও বেশি মামলা হয়েছে। বিএনপির কর্মসূচি সফল করতে মা ও ছেলে একসঙ্গে দিনের পর দিন রাজপথে পিকেটিং করেছি এমন দৃশ্য রাজনীতিতে খুবই বিরল। সংগ্রামের ইতিহাস কখনো রাতারাতি তৈরি হয় না। ত্যাগ, রক্ত, কারাবরণ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়েই একটি রাজনৈতিক পরিবারের পরিচয় গড়ে ওঠে। আমাদের পরিবার সুবিধাবাদী বা হাইব্রিড রাজনীতির প্রতিনিধি নয়, আমরা দুঃসময়ে রাজপথে থাকা, ত্যাগ স্বীকার করা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার মাধ্যমে নিজেদের বিএনপির পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয় পত্রিক গুলোতেই দেখেছি গত ৫ আগস্টের পর উনি কি করছেন। সেসব সংবাদ দেখলে মনে হয় তিনি নারায়ণগঞ্জের লেডি মাফিয়া হয়ে উঠেছেন।
প্রসঙ্গত, আফসানা আফরোজ বিভা গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শহরের অপরাধ জগতের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন।
নিতাইগঞ্জ থেকে ভোলাইল পর্যন্ত পরিবহনে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অপহরণের পর মুক্তিপন আদায়, ভূমিদস্যুতা, কিশোরগ্যাং নিয়ন্ত্রণ সহ বিভিন্ন অপরাধে ঘুরে ফিরে একটি নামই উঠে আসে সাব্বির আহম্মেদ শহীদ। যে সর্বস্তরে ডাকাত শহীদ নামে পরিচিত। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে নিতাইগঞ্জের ট্রাক চালকেরা। এবার ডাকাত শহীদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে মাঠে নামবে নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকা এই সাব্বির আহম্মেদ শহীদ এর নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।
ডাকাত শহীদ নারায়ণগঞ্জ ট্যাংক লড়ি কার্ভাট ভ্যান চালক শ্রমিক ইউনিয়ন এর সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হয়েছেন ৫ আগস্টের পর। এর পূর্বে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্মী। ছিলেন প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের অন্যতম সহযোগী। ৫ আগস্টের পর আজমেরী ওসমান দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে ডাকাত শহীদ বনে যান বিএনপি নেতা।
আর তাকে নিতাইগঞ্জে ওই কমিটিতে অধিষ্ঠিত করেছেন মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি হাসান আহম্মেদ। তিনি ওই কমিটির সভাপতি। তবে হাসান আহম্মেদ শারীরিক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ হওয়ায় তার সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র আফসানা আফরোজ বিভা।
জানা গেছে, এর আগে শহীদ ওরফে ডাকাত শহীদের শেল্টার দেয়া বন্ধে সাবেক কাউন্সিলর বিভাকে সতর্ক করা সহ কেউ যেন তাকে শেল্টার না দেয় সেই বার্তা দিয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। গত ৩০ জুন নাসিক প্রশাসক এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে শহীদ ওরফে ডাকাত শহীদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৎপর এমন তথ্য জানান বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীকে। এসময় সাবেক কাউন্সিলর বিভা হাসানকেও ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। মূলত কেউ যেন শহীদের বিষয়ে সুপারিশ না করে এবং তার অপকর্মের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সহযোগীতা করা হয় এমন বার্তা পৌছান তিনি।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ট্রাক ট্যাংকলরি কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি সুজন মাহমুদ। তিনি বলেন, আমি সিটি করপোরেশনের যানজট নিরসন কমিটির সদস্য। আমি একটি ব্যক্তিগত কাজে সিটি করপোরেশন গিয়েছিলাম, তখন শুনেছিলাম প্রশাসক সাহেব ফোন করে বিভা হাসানকে বলছেন, তোমরা ডাকাত শহীদকে সেক্রেটারি বানিয়েছো কেন? তার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেগেটিভ রিপোর্ট আসছে। তারে বাদ দিয়ে ভালো মানুষকে নিয়ে কমিটি বানাও।



































আপনার মতামত লিখুন :