ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের বাড়ছে রাজনৈতিক তৎপরতা। তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি, তবে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে চলছে গণসংযোগ, সামাজিক কর্মকা-, মতবিনিময় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ।
জেলার পাঁচ উপজেলায় রয়েছে ৩৯টি ইউনিয়ন পরিষদ। নির্বাচন ঘিরে এসব ইউনিয়নে যেমন সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে, তেমনি স্থানীয় রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা নেতাদের অনেকে ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাব, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও প্রার্থী বাছাইয়ের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক ব্যক্তি চেয়ারম্যান পদে নিজেদের প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন। কেউ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনছেন, কেউ এলাকায় সামাজিক কর্মকা-ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন। আবার কেউ কেউ সংসদ সদস্য ও দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে সম্ভাব্য মনোনয়ন বা সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে সংসদ সদস্যদের জন্যও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কাজ করেন। ফলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকা-ে তাদের ভূমিকা কম নয়। এ কারণে অনেক সংসদ সদস্য ও তাদের অনুসারীরা নিজেদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলেন এমন প্রার্থীদের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে।
তবে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, মাঠের বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। কোনো ইউনিয়নে একজন প্রার্থীর শক্তিশালী ব্যক্তিগত অবস্থান থাকলেও দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ অন্য কাউকে চাইতে পারেন। কোথাও আবার একই দলের একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। কয়েকটি দল এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে কাজ শুরু করেছে। খেলাফত মজলিসও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে দলীয় সমর্থন ও সমঝোতা। একই ইউনিয়নে একাধিক দলের প্রার্থী থাকলে ভোটের মাঠে সমীকরণ কী দাঁড়াবে, সেটিও এখন থেকেই হিসাব করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আবার রাজনৈতিক জোট বা সমমনা দলগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা হলে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনেক বেশি ব্যক্তি ও স্থানীয় সম্পর্কনির্ভর। প্রার্থীর পারিবারিক পরিচয়, দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকা-, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে শুধু দলীয় পরিচয় দিয়ে সব ইউনিয়নে প্রার্থী নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।
এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে নিজেদের এলাকায় দৃশ্যমান হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কথা বলা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার প্রবণতা বেড়েছে। কেউ কেউ আবার এলাকায় নিজের সমর্থকদের নিয়ে ছোট ছোট বৈঠক করছেন।
তবে তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এই তৎপরতার অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক। শেষ পর্যন্ত কারা প্রার্থী হবেন, তা নির্ভর করবে দলীয় সিদ্ধান্ত, স্থানীয় সমীকরণ এবং নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।
নারায়ণগঞ্জের ইউনিয়নগুলোতে এখন তাই একদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, অন্যদিকে দলীয় নেতাদের হিসাব-নিকাশ। কে কার সমর্থন পাচ্ছেন, কোন ইউনিয়নে কোন পক্ষ শক্তিশালী হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কারা ভোটের মাঠে থাকছেন এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নির্বাচনের তফসিল ও প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর। তবে তার আগেই রাজনীতিতে ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে যে নীরব প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, তা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
































আপনার মতামত লিখুন :