ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অদ্বিতীয় একটি জনপদ। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এবং আধুনিক জনপদ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ ইতিহাসখ্যাত। বর্ণাঢ্য অতীত সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এ অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্প ও বানিজ্যের অগ্রযাত্রা। তাঁতবস্ত্র, মৃৎশিল্প সহ বিভিন্ন ধরনের কুটির শিল্পের মাধ্যমে শিল্পায়নের যাত্রা শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে তা পরিণত হয় বিভিন্নমুখী শিল্পে। নারায়ণগঞ্জ পরিণত হয় বিভিন্ন শিল্প ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্য অঞ্চলে।
বিভিন্ন নদী-বিধৌত নারায়ণগঞ্জের ফসলি জমি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় ফসল উৎপাদনেও দেশের শীর্ষস্থানীয় অঞ্চল সমূহের অন্যতম ছিল নারায়ণগঞ্জ। প্রচুর ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্পায়নের ফলে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে শক্তিশালী অর্থনীতির অঞ্চল।
পাট শিল্পের উত্থান নারায়ণগঞ্জকে এনে দেয় আরো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল সহ অসংখ্য পাট নির্ভর শিল্প গড়ে ওঠায় প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে নারায়ণগঞ্জ।
পাটশিল্পের পাশাপাশি বস্ত্র শিল্প সহ অন্যান্য শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ফলে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে দেশের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল। বর্ণাঢ্য অতীত এবং বর্ণিল বর্তমানের মিশেলে নারায়ণগঞ্জ লাভ করে এক অদ্বিতীয় মর্যাদা। দেশের অর্থনীতিতে যার অবদান অনন্য হয়ে ওঠে। সবধরনের নাগরিক পরিষেবা সম্বলিত আধুনিক জনপদে পরিণত হয় নারায়ণগঞ্জ যা ছিল তৎকালীন সময়ে ঢাকার চেয়েও অনেকাংশে উন্নত।
নারায়ণগঞ্জ তথা সারা দেশের জন্য শিল্পায়ন হয়ে ওঠে আশীর্বাদ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে একদার আশীর্বাদ আজ নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য হয়ে উঠেছে অভিশাপ স্বরূপ।
বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা কমে যাওয়ায় পাট শিল্প নির্ভর প্রতিষ্ঠানসমূহ ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হতে থাকে। সেসব অবস্থানে গড়ে ওঠে অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান যার অধিকাংশই অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত।
অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে নারায়ণগঞ্জবাসীর নাগরিক জীবন দিন দিন দুঃসহ হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে অচিরেই নারায়ণগঞ্জ পরিণত হবে বসবাসের অযোগ্য জনপদে।
অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত সংকট বর্তমান সময়ে জেলাটির অন্যতম প্রধান সমস্যা। 'প্রাচ্যের ডান্ডি' খ্যাত নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলেও পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী নীতি এবং তদারকির অভাবে এই শিল্পায়ন এখন জনজীবন ও প্রকৃতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ডাইং, ওয়াশিং, টেক্সটাইল, কাগজ এবং কেমিক্যাল কারখানাগুলোর অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি পার্শ্ববর্তী নদীগুলোতে ফেলা হচ্ছে। নদীর পানি এখন বর্জ্যরে কারণে আলকাতরার মতো কালো ও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় অধিকাংশ নদী এখন 'বায়োলজিক্যালি মৃত প্রায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম থাকা সত্ত্বেও অনেক কারখানা আইন অমান্য করে ইটিপি ব্যবহার না করেই তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে বা ড্রেনে মুক্ত করছে।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক জরিপ এবং বিভিন্ন পরিবেশগত গবেষণায় দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সিমেন্ট কারখানা, স্টিল মিল এবং অবৈধ ইটভাটাগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া ও উড়ন্ত ছাই বাতাসে বিষ ছড়াচ্ছে। ঘরের চালের ওপর ছাইয়ের আস্তরণ জমে যাচ্ছে, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্পবর্জ্যরে বিষাক্ত রাসায়নিক মাটির নিচে প্রবেশ করায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, শীসা প্রভৃতি ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলোর ভেতরেই গড়ে উঠেছে হোসিয়ারি, ছোট ডাইং ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প। কারখানার জেনারেটর এবং যন্ত্রপাতির তীব্র শব্দ ও কম্পন স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, বিশেষ করে শিশুদের পড়াশোনা ও ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ তথা সারাদেশের জন্য একসময় যে শিল্প ছিল আশীর্বাদ জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তা এখনও আশীর্বাদ হিসেবে থাকলেও নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য তা অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রধান কারণ যুগোপযোগী নীতিমালা প্রনয়ণ, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং তদারকির অভাব। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ কোন ভাবেই কাম্য নয়। কারণ তা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। তাই জাতীয় স্বার্থে নারায়ণগঞ্জবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ এগিয়ে আসবেন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবেন, সাধারণ মানুষ এমনটিই চায়।
লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা































-20260912144331.jpg)









আপনার মতামত লিখুন :