News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জে যেসব সমস্যায় নজর কম


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১০:১৭ পিএম নারায়ণগঞ্জে যেসব সমস্যায় নজর কম

শিল্পনগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই জেলার ব্যস্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা নিয়ে আলোচনা হয় নিয়মিত। যানজট, জলাবদ্ধতা, সড়কের দুর্ভোগ কিংবা নদীদূষণ নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু এসব বহুল আলোচিত সমস্যার আড়ালে প্রতিদিনের জীবনে আরও কিছু সংকট তৈরি হচ্ছে, যেগুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা বা দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে কম।

নগরীর সবচেয়ে বড় অদৃশ্য সংকটগুলোর একটি হলো খোলা জায়গার সংকট। বাড়িঘর, মার্কেট, কারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা বাড়লেও মানুষের বসার, হাঁটার কিংবা শিশুদের খেলাধুলার জায়গা কমছে। নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, নারায়ণগঞ্জে জনপরিসর ও বিনোদনের ব্যবস্থা বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শিশুদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক আবাসিক এলাকায় খেলার মাঠ নেই। কোথাও মাঠ থাকলেও সেটি বাণিজ্যিক ব্যবহার, নির্মাণসামগ্রী রাখা কিংবা নানা অস্থায়ী ব্যবহারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জায়গা ক্রমেই কমছে। অথচ শহরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পনায় এই বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাঁটার জায়গার সংকট। প্রধান সড়কের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হলেও ফুটপাতের বড় অংশ পথচারীবান্ধব হয়ে উঠছে না। কোথাও দোকান, কোথাও পার্ক করা মোটরসাইকেল, আবার কোথাও বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা নির্মাণসামগ্রী পথচারীর চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে কয়েকশ মিটার পথ যেতেও মানুষকে সড়কে নেমে হাঁটতে হচ্ছে। যানজট কমানোর আলোচনা হলেও নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়।

শব্দদূষণও নগরজীবনের একটি নীরব সমস্যা। ব্যস্ত সড়কে হর্ন, ভারী যানবাহন, অবৈধ হাইড্রোলিক হর্নসহ বিভিন্ন উৎস থেকে শব্দদূষণ হচ্ছে। এ নিয়ে অভিযান ও জরিমানাও হয়েছে। তবে অভিযান শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি কতটা বদলায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।

আরেকটি কম আলোচিত সংকট পানিনিষ্কাশনের পথ হারিয়ে যাওয়া। সামান্য বৃষ্টিতে কোথাও পানি জমার কারণ হিসেবে সাধারণত ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা বলা হয়। কিন্তু এর পেছনে থাকা খাল ও জলাধারগুলোর বর্তমান অবস্থার দিকে সবসময় নজর পড়ে না। কাশিপুর খাল একসময় নৌযান চলাচলের উপযোগী ছিল; দখল, শিল্পবর্জ্য ও আবর্জনায় সেটি এখন অস্তিত্বসংকটে।

বন্দরেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। ডিএনডি এলাকার বাস্তবতাও একই। পানিনিষ্কাশনের খাল দখল, ভরাট ও আবর্জনায় সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে না পারার অভিযোগ রয়েছে। ফলে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হলে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর বাইরে রয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সংকট। বাসাবাড়ি ও বাজারের বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে, কতটা বর্জ্য নিয়মিত সংগ্রহ হচ্ছে, কতটা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হচ্ছে এসব প্রশ্ন সাধারণত বড় খবর হয় না। অথচ বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খাল, নালা ও নদীতে গেলে সেটিই আবার জলাবদ্ধতা ও পরিবেশদূষনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে শিল্পবর্জ্য ও আবাসিক বর্জ্যের সম্পর্কটিও নতুন করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শীতলক্ষ্যা ও আশপাশের জলাশয়ের দূষণ নিয়ে বহুদিনের আলোচনা থাকলেও ছোট খাল, নালা ও ড্রেন দিয়ে কীভাবে দূষিত পানি নদীতে পৌঁছাচ্ছে, সেটি নিয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নগর পরিকল্পনা ও বাস্তব উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। একটি এলাকায় সড়ক তৈরি হলেও পাশে পর্যাপ্ত ড্রেন নেই, কোথাও ড্রেন করা হলেও তার সঙ্গে খালের সংযোগ নেই; আবার কোথাও রাস্তা উন্নয়নের সঙ্গে পথচারী চলাচল কিংবা পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্য সমস্যা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, কাশিপুর, বন্দর কিংবা রূপগঞ্জ শিল্প ও আবাসিক এলাকা দ্রুত বিস্তৃত হলেও সব জায়গায় একই গতিতে নাগরিক অবকাঠামো তৈরি হয়নি। কোথাও পানি সরবরাহের সমস্যা, কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও সড়ক ও পরিবহনের চাপ এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে অবকাঠামোর সমন্বয় না হওয়ারই প্রতিফলন।

নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলে তাই শুধু নতুন সড়ক, ভবন কিংবা প্রকল্পের হিসাব নয়, মানুষ কীভাবে হাঁটছে, শিশুরা কোথায় খেলছে, বৃষ্টির পানি কোথায় যাচ্ছে, বর্জ্য কোথায় জমছে এবং শহরে মানুষ কোথায় একটু স্বস্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারছে এসব প্রশ্নও সামনে আসা প্রয়োজন।

কারণ একটি শহর শুধু ভবন আর সড়ক দিয়ে বড় হয় না। শহর তখনই বাসযোগ্য হয়, যখন উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট প্রয়োজনগুলোও পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জের সামনে এখন সেই প্রশ্নটিই বড় হয়ে উঠছে শহরটি কতটা বড় হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, শহরটি কতটা বাসযোগ্য হচ্ছে।