চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সাল গ্রেপ্তার হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ। সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকায় পদ্মা অয়েল পিএলসির ডিপোর কর্মীদের কাছে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে করা মামলায় মঙ্গলবার দুপুরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সংসদ তাঁকে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করে।
ফয়সালকে ঘিরে এই ঘটনা একেবারেই বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ নয় এমন আলোচনা শুরু হয়েছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে। গত কয়েক মাসে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার কারণে নির্বাচনের পর রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠা দলটির স্থানীয় ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১ জুলাই গোদনাইলের পদ্মা অয়েল ডিপোর জেট-এ-১ পয়েন্টে কর্মরত একজন চেকারকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ফয়সাল চাঁদা দাবি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ১ আগস্ট ফয়সাল ১০ থেকে ১২ জনকে নিয়ে ডিপোর জেট-এ-১ পয়েন্টে গিয়ে একই পরিমাণ চাঁদা দাবি করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, চাঁদাবাজির অভিযোগে করা মামলার ভিত্তিতেই ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ফয়সালকে ঘিরে অভিযোগের আলোচনা এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের মার্চে সিদ্ধিরগঞ্জের এক ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে ড্রেজার ব্যবসা থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছিলেন। এ ছাড়া গত ১ আগস্ট পদ্মা অয়েলের গোদনাইল ডিপোতে কর্মী পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ফয়সাল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কর্মীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও প্রকাশ্যে আসে।
ঘটনার পর কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তও তাৎপর্যপূর্ণ। মঙ্গলবার সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে ফয়সালকে দলীয় নীতি, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সংগঠনবিরোধী কর্মকা-ে সরাসরি জড়িত থাকার ‘সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে’ বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।
ফয়সালকে বহিষ্কারের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন নারায়ণগঞ্জে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে চাঁদাবাজির অভিযোগে জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল এবং পরে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এর পাশাপাশি গত কয়েক মাসে ঝুট ব্যবসা, বালু ব্যবসা, পরিবহন ও বিভিন্ন স্থানীয় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ফতুল্লার এনায়েতনগরে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়িক আধিপত্য নিয়ে বিরোধ এবং কাঁচপুরে বালু ব্যবসা ও ঘাট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাগুলো স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এসব ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। ফলে প্রতিটি ঘটনার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনগত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত বিষয়। তবে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর বড় দল হিসেবে বিএনপির সামনে এখন সংগঠনকে তৃণমূল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘদিন রাজপথের বাইরে থাকা নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা যেমন দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হলে তার দায়ও দলীয় নেতৃত্বের ওপর এসে পড়ে।
বিশেষ করে চাঁদাবাজির অভিযোগ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ কোনো নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের অভিযোগ হিসেবে থাকে না; তাঁর দলীয় পরিচয়ও আলোচনায় আসে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে একজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রভাব অনেক সময় পুরো সংগঠনের ভাবমূর্তিতে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে তাকে কত দ্রুত সাংগঠনিকভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ফয়সালের ক্ষেত্রে অবশ্য কেন্দ্রীয় কৃষকদলের দ্রুত বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দলীয়ভাবে অভিযোগের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এই ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির সক্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের কর্মকা-ও এখন আগের চেয়ে বেশি নজরে আসছে। ফয়সালের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের ঘটনায় সেই বিতর্কই আবার সামনে এসেছে। একদিকে অভিযোগের বিষয়ে আইনি তদন্ত চলছে, অন্যদিকে দলীয় নেতৃত্বও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। এখন সামনে প্রশ্ন হলো, এটি কি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হিসেবেই থাকবে, নাকি সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ঘিরে ওঠা ধারাবাহিক অভিযোগের পর দলটি আরও কঠোর সাংগঠনিক অবস্থানে যাবে। নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে এ প্রশ্নের উত্তরই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।





































আপনার মতামত লিখুন :