News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জে গড়ে প্রতিদিন ভাঙছে ৯ সংসার


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম নারায়ণগঞ্জে গড়ে প্রতিদিন ভাঙছে ৯ সংসার

নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা নাফিসা আক্তার (ছদ্মনাম)। বর্তমানে তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। বর্তমানে তার একটা ভালো অবস্থান তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি তার এক ছেলে সন্তান নিয়ে একাই বসবাস করছেন। তবে বেশ কয়েক বছর আগেও তার জীবন এরকম ছিল না। তিনি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

নাফিসা আক্তার বলেন, পরিবারের সব সদস্যদের পছন্দে এবং তার ইচ্ছা অনুযায়ী একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। আমার স্বপ্ন ছিল- স্বামীর সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকবো। কখনও ঘরের বাইরে কোনো কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবো না। কিন্তু ভাগ্যের নিয়তি স্বামীর সংসারে আমার ঠিকানা হলো না। বিয়ের কিছুদিন পরই স্বামীর আচার আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। প্রথমদিকে খারাপ ব্যবহার তারপর মারধরসহ নানাভাবে নির্যাতন নিপীড়ন।

শারীরিক মানসিক নির্যাতনের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদগুলো হয়ে থাকে। অনেক সময় স্বামীরা মাদকাসক্তের কারণে পারিবারিক অশান্তি হয়ে থাকে। মাদক সেবন করে যৌতুকের জন্য স্ত্রীদের মারধর করে থাকে। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে মোবাইলের মাধ্যমে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠে। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় শ্বশুর বাড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে স্ত্রীরা সংসার করতে চায় না। পরকীয়া কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক এসব কারণেই বিাবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। 

এক পর্যায়ে বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য মারধর করাসহ নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু বাবার বাড়ি টাকা এনে সংসার করার ইচ্ছা হয়নি। তাই আমার স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর জীবনের নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এই পর্যায়ে এসেছি।

নাফিসা আক্তারের মতো এরকম অনেক জীবন কাহিনী রয়েছে নারায়ণগঞ্জে। আর প্রতিটি কাহিনীর সঙ্গেই রয়েছে নানা রকমের ঘটনা। রয়েছে দুঃখ কষ্ট বেদনা। এটা শুধু নারীদের বেলায় ঘটছে তা নয়; পুরুষের বেলায়ও এরকম অনেক ঘটনা রয়েছে। তবে পুরুষের হয়তো রয়েছে ভিন্নতা।

বিগত কয়েক বছর ধরেই নারায়ণগঞ্জে বেশ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা। প্রায় প্রতিদিনই গড়ে ৯ টি করে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে নারায়ণঞ্জজুড়ে। এভাবে করে বিগত ৮ বছরে নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২৬ হাজার ১৩৫ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মাদকাসক্তি, বিবাহবর্হিভূত সম্পর্ক, দ্বিতীয় বিয়ে, পারিবারিক কলহ, অভাব-অনটন, বনিবনা না হওয়াসহ নানা কারণে এসকল বিচ্ছেদের ঘটনাগুলো ঘটছে

অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণেও বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। স্ত্রী সবসময় স্বামীকে নিজের করে রাখতে চায়। বিপরীতে স্বামীকে সব দিক দিয়ে সবাইকে নিয়ে থাকতে হয়। কিন্তু এটা আবার স্ত্রীর সহ্য হয় না। আর স্বামীকে নিজের বশে রাখতে গিয়ে কোর্টে মামলা করে দেয়। পরবর্তীতে এই সংসার আর টিকে না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলায় মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে ১০ হাজার ২০৬টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৬৩৫ জনের। সে হিসাবে এ বছর প্রতিদিন গড়ে ৯ টিরও বেশি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলায় মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে ৮ হাজার ৪৬৭টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৫২০ জনের। সে হিসাবে এ বছর প্রতিদিন গড়ে ৯ টিরও বেশি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলায় মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে ৭ হাজার ৯৪৫টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৩৫২ জনের। সে হিসাবে এ বছর প্রতিদিন গড়ে ৯টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুন

তবে ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলায় মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে ৮ হাজার ১৮৩টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ জনের। সে হিসাবে এ বছর প্রতিদিন গড়ে ৮ টিরও বেশি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক নারায়ণগঞ্জে বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে ৮ হাজার ১৮৩টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ জনের। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আটটির বেশি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

অভাব-অনটনের কারণে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে নারী নির্যাতন, যৌতুকসহ একাধিক বিয়ের প্রবণতা বৃদ্ধিও অন্যতম কারণ। বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদ সহজ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে গেছে। নারীরাও অনেক সচেতন হয়েছে। আগে অনেক নির্যাতন সহ্য করে হলেও সংসার করতে চেয়েছে। এখন আর এটা হয় না। এসব কারণেই প্রতিনিয়ত সংসার ভাঙছে।

২০২০ সালের একটি তথ্য বলছে, ওই বছর জেলায় ৭ হাজার ৩২৬টি বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়। তার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ২ হাজার ৫৬৩টি। ২০১৯ সালে ৯ হাজার ৭১৫টি বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে। এর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ২৯৮টি।

এর আগের বছর ২০১৮ সালে ১০ হাজার ১২৩টি বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে। বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৪৮৩টি। এসব পরিসংখ্যান বলছে নারায়ণগঞ্জে বেশ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদ। সবমিলিয়ে বিগত ৮ বছরে ২৬ হাজার ১৩৫ বিচ্ছেদটি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, পরিবারের বাইরে গিয়ে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের আগে যখন সম্পর্ক ছিল তখন মনে হতো এর চেয়ে ভালো মেয়ে কোথাও পাবো না। তাকে নিয়েই আমি সুখী হতে পারবো। কিন্তু বিয়ের পর একেবারেই উল্টা চিত্র দেখা যায়। আমার বাবা-মায়ের সেবার করতে চায় না। আমার পরিবার তার কাছে ভালো লাগে না। পরিবার থেকে আলাদা হওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে।

জামাল উদ্দিন বলেন, পরিবার থেকে আলাদা না হওয়ায় আমার নামে কোর্টে গিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করে দেয়। মামলা করার পর তাকে নিয়ে সংসার করার ইচ্ছা আর হয়নি। পরবর্তীতে তার সাথে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেই।

নারায়ণগঞ্জ জেলা কাজি সমিতির সভাপতি মো. ইসলাম মিয়া বলেন, অভাব-অনটনের কারণে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে নারী নির্যাতন, যৌতুকসহ একাধিক বিয়ের প্রবণতা বৃদ্ধিও অন্যতম কারণ। বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদ সহজ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে গেছে। নারীরাও অনেক সচেতন হয়েছে। আগে অনেক নির্যাতন সহ্য করে হলেও সংসার করতে চেয়েছে। এখন আর এটা হয় না। এসব কারণেই প্রতিনিয়ত সংসার ভাঙছে।

নারায়ণগঞ্জ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী মামুন বলেন, অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণেও বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। স্ত্রী সবসময় স্বামীকে নিজের করে রাখতে চায়। বিপরীতে স্বামীকে সব দিক দিয়ে সবাইকে নিয়ে থাকতে হয়। কিন্তু এটা আবার স্ত্রীর সহ্য হয় না। আর স্বামীকে নিজের বশে রাখতে গিয়ে কোর্টে মামলা করে দেয়। পরবর্তীতে এই সংসার আর টিকে না।

নারায়ণগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম মোল্লা বলেন, মোবাইল আসক্তি, মাদকাসক্তি, পরকীয়া, স্বামী স্ত্রী একে অপরকে সময় না দেওয়া ও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে না চলাসহ নানা কারণেই এই বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়েছে। আর বিচ্ছেদের আমাদের সামাজিক অবক্ষয় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সবাইকেই সচেতন হওয়াটা জরুরি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ভিকারুন নেছা বলেন, শারীরিক মানসিক নির্যাতনের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদগুলো হয়ে থাকে। অনেক সময় স্বামীরা মাদকাসক্তের কারণে পারিবারিক অশান্তি হয়ে থাকে। মাদক সেবন করে যৌতুকের জন্য স্ত্রীদের মারধর করে থাকে। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে মোবাইলের মাধ্যমে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠে। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় শ্বশুর বাড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে স্ত্রীরা সংসার করতে চায় না। পরকীয়া কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক এসব কারণেই বিাবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।