নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে যৌতুকের দাবিতে নববধূ ঐশী পোদ্দার (১৯) হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে।
ঐশী পোদ্দারের পিতার দায়ের করা মামলায় নিহতের স্বামী শান্ত কুমার রায় (৩১), শ্বশুর শিবু রায় (৬৬) ও শাশুড়ি লক্ষী রানী রায়কে (৫৫) পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করলেও একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর পায়তারা করছে।
তারা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধতনদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগে জানা গেছে।
নিহতের পরিবার জানায়, ১ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভার উলুকান্দি পশ্চিমপাড়া এলাকায় স্বামী শান্ত কুমার রায়ের বাড়ি থেকে ঐশী পোদ্দারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঐশী কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শাহাপাড়া এলাকার শংকর পোদ্দারের মেয়ে। পরিবারের দাবি, বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। বিয়ের সময়ে নগদ ১২ লাখ টাকা যৌতুক ও ১২ভরি ওজনের স্বর্নালংকার প্রদান করলেও বিয়ের ১ মাস যেতে না যেতেই শ্বশুর ও শাশুড়ির অত্যাচারের কারণ জানতে চাইলে আরো যৌতুকের টাকা লাগবে বললে আর কোন টাকা দিতে পারবেনা বলাতেই প্রতিনিয়ত ঐশীকে মারধর করতো।
উক্ত বিষয়ে ঐশী তার পিতাকে অবহিত করিলে শ্বশুর ঐশীর পিতাকে সরাসরি বলে আসে আরো যৌতুকের অর্থ না দিলে ঐশীর ক্ষতি হবে। সদ্য বিয়ে দেয়া মেয়ের সুখ শান্তির কথা ভেবে আরো সাড়ে ৪ লাখ টাকা প্রদান করলেও শান্তর ব্যবসার কথা বলে শ্বশুর ও শাশুড়ি আরো ২০ লাখ টাকা দাবি করে। অন্যথায় ঐশীর সঙ্গে শান্তর ডিভোর্স করাবে অথবা যেকোন বড় ধনের ক্ষতি হইবে বলে হমকি দেয়।
ঐশীর বাবা শংকর পোদ্দার অভিযোগে জানান, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য তার মেয়ের ওপর স্বামী শান্ত কুমার রায় ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। তিনি বলেন, মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় প্রায় দেড় মাস আগে জামাতাকে আরও টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও নির্যাতন ও টাকার দাবি বন্ধ হয়নি। শংকর পোদ্দারের অভিযোগ, ঘটনার রাতে শান্ত কুমার, তার বাবা শিবু রায় ও মা লক্ষ্মী রানী মিলে ঐশীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে ওড়না দিয়ে মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
নিহত ঐশীর পরিবার আরো বলেন, পুলিশ ঘটনার পর স্বামী শ্বশুর ও শাশুড়িকে গ্রেফতার করেছে। তবে একটি প্রভাবশালী মহল তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা চলছে।
নিহত ঐশীর স্বামী শ্বশুর ও শাশুড়ি মিলে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালালেও নিহত ঐশীর দেহ খাটে অর্ধবসা ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল যাতে বোঝা যায় তাকে হত্যার পরে সেটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল নিহতের স্বামী শ্বশুর ও শাশুড়ি। সেসময় বিবাদীগনের প্রতিবেশীর মোবাইল দ্বারা নিহত ঐশীর মৃত দেহের ছবি উঠিয়ে রাখায় বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌছে নিহত ঐশীর দেহ খাটে অর্ধবসা ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পায়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর নিহতের পিতা মামলা দায়ের করলে পুলিশ নিহতের স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে গ্রেফতার করে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন জানান, নিহতের বাবার মামলার ভিত্তিতে প্রধান তিন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রতিবেদন ও তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে আদালতে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন দেওয়া হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে গত ৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে ঐশী হত্যার বিচার ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা। কর্মসূচিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ঐশীর মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা। তারা দ্রুত মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোঃ হুমায়ুন কবির নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, প্রাথমিক তদন্তে গ্রেফতারকৃত উক্ত আসামীগণ অত্র মামলার ঘটনার তারিখ ও সময়ে অত্র মামলার ঘটনা সংঘটন করিয়াছে মর্মে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমান পাওয়া যায়। মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে। আসামীগণ জামিনে মুক্ত হইলে পলাতক হইয়া মামলার তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে মামলার তদন্ত কার্য সম্পাদন না হওয়া পর্যন্ত আসামীদের আটক রাখা প্রয়োজন।






































আপনার মতামত লিখুন :